ইদানিংকালে চঞ্চল চৌধুরী যেন জাদুর পরশপাথর, যেখানে যাচ্ছেন, ছুঁয়ে দিলেই ফলছে সোনা।
‘আয়নাবাজি’ সিনেমার শেষের দিকের দৃশ্য, ধুরন্ধর রাজনৈতিক নিজাম সাঈদ চৌধুরীর ছদ্মবেশে আমাদের খুব চেনা আয়না। জেলের ভেতরের কষ্টকর জীবন, মানসিক দুশ্চিন্তা সবকিছু মিলিয়ে ভেঙ্গে পড়েছে আয়নার শরীর। শুধু মেকআপে ভরসা রাখতে চাননি নির্মাতা অমিতাভ কিংবা অভিনেতা চঞ্চল কেউই। আর তাই টানা তিনমাস ভাত মুখে তোলেন নি, সারাজীবনে কখনো ব্যায়াম না করা চঞ্চল বাসায় ট্রেনার নিয়ে জিম করেছেন নিয়মিত।
আর এত সব কিছু স্রেফ এক মিনিটেরও কম দৈর্ঘ্যের দৃশ্যের জন্য। চঞ্চল চৌধুরী ঠিক এতোটাই ডেডিকেটেড, এতোটাই সিরিয়াস পারফেকশনের প্রতি। সোনা ফলানো কি আর এতো সহজ?
শান্ত ছেলেবেলার চঞ্চল
শিরোনামের কথাটা কিন্তু আসলেও সত্যি। পিতৃপ্রদত্ত নাম সুচিন্ত চৌধুরী চঞ্চল, একাডেমিক সার্টিফিকেটও হয়েছে এ নামেই। কিন্তু মিডিয়ায় এসে আমাদের কাছে হয়ে গেছেন চঞ্চল চৌধুরী।

পরিবার, বন্ধুবান্ধবরাও চঞ্চল নামেই ডেকে অভ্যস্ত। সাতক্ষীরার মফস্বলে ছেলেবেলা কাটানো চঞ্চল চৌধুরী কিন্তু মোটেও দূরন্ত চঞ্চল ছিলেন ভীষণ শান্তশিষ্ট স্বভাবের। ইন্টারমিডিয়েটের পর ঢাকায় আসেন, ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়।
গান, নাটক আর চারুকলা
চঞ্চল চৌধুরীর পারিবারিক আবহে সাংস্কৃতিক ছোঁয়া ছিল বেশ। ছোটবেলায় শেখানো হয়েছে গান অন্য ভাইবোনদের সাথে, কিন্তু চঞ্চলকে কেন যেন টানেনি তেমন সেসময়। ছবি আঁকতেন, সে আগ্রহ থেকেই চারুকলায় আসা। ঢাকায় এসে বন্ধুত্ব হয়েছিল ‘জলের গান’ ব্যান্ডের রাহুল আনন্দের সাথে। রাহুলের থিয়েটারে আগ্রহ, সংক্রমিত হয় চঞ্চল চৌধুরীর মধ্যেও। তারপর ঢাকার থিয়েটারে এমন মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হলেন যে অভিনয়ই হয়ে গেল তার নেশা আর পেশা। যোগ দেন প্রখ্যাত অভিনেতা ও নাট্য সংগঠক মামুনুর রশীদের নাট্যদল ‘আরণ্যকে’।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, থিয়েটার করতে আসা রাহুল আনন্দ আমাদের কাছে পরিচিত হলেন গানের মানুষ হিসেবে, আর চঞ্চল অভিনয়ে। তবে চঞ্চল যেমন মাঝে মাঝে গানও করেন ইদানিং, রাহুল আনন্দও থিয়েটারকে আড়ি জানাননি পুরোপুরি কখনো।
প্রথম সিনেমা ‘রূপকথার গল্প’ কিন্তু জীবন?
২০০৬ সালে এসে তৌকির আহমেদের ‘রূপকথার গল্প’ সিনেমায় নবাগত হিসেবে এসেই বাগিয়ে নিয়েছিলেন মেরিল-প্রথম আলো পুরষ্কারে সেরা অভিনেতার খেতাব, চঞ্চল চৌধুরীর জীবনটাকেও কি রূপকথার গল্প বলেই মনে হচ্ছে? যেখানে হাত দিয়েছেন, ফলেছে সোনা?
চঞ্চল চৌধুরীর সিনেমা ক্যারিয়ার দেখলে এমনই মনে হয় যদিও, কিন্তু তার আগে দীর্ঘ দেড় যুগের সংগ্রামকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

আরণ্যকে যোগ দেয়ার পর দীর্ঘদিন ব্যাকস্টেজে কাজ করেছেন, রিহার্সালে কেউ দেরীতে আসলে কিংবা অনুপস্থিত থাকলে সে জায়গায় দাড়িয়ে টুকটাক সংলাপ বলার সুযোগ মিলতো, খুচরো চরিত্রও জুটে যেত কখনোসখনো। কিন্তু ততদিনে মঞ্চের নেশা ভালোমতোই পেয়ে বসেছে চঞ্চলকে, ধৈর্য্য না হারিয়ে লেগে ছিলেন।
প্রথম অভিনয় দেখানোর সুযোগ মেলে ‘কালো দৈত্য’ নাটকে, আরণ্যকের হয়ে মিলেছিল প্রথমবারের মতো কোন বড় চরিত্র। এরপর একে একে রাঢ়াঙ, শত্রুগণ, সংক্রান্তির মতো নাটকে মঞ্চ মাতিয়েছেন, আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
গ্রামের সহজ সরল চরিত্রের ছাপ
টেলিভিশনে প্রথম সুযোগ পান ফরিদুর রহমানের মাধ্যমে, ২০০০ সালে ‘গ্রাস’ নাটকে। ধীরে ধীরে কমতে থাকলো মঞ্চের আশেপাশে আনাগোনা, বোকাবাক্সে বন্দী হতে থাকলেন চঞ্চল। ততদিনে ছাত্রজীবন শেষ, মাথায় চাপ ছিল রুটিরুজিরও। তবে মঞ্চের সাথে একেবারে আড়ি কিন্তু ঘটেনি, মঞ্চের প্রতি ভালোবাসাটা এখনো যে অমলিন, তা তার হাজার ব্যস্ততার মাঝেও হঠাৎ মঞ্চে ওঠা থেকেই বোঝা যায়।
মঞ্চের মতো টেলিভিশনের পথটাও মসৃণ ছিল না চঞ্চল চৌধুরীর জন্য, মনোযোগ কাড়তে পারেননি প্রথমেই। প্রথমবারের মতো লাইমলাইটে আসেন সালাউদ্দিন লাভলু আর বৃন্দাবন দাসের সাথে কাজ করে। এই তিনজনের জুটির কাজ মানেই তখন দর্শকদের কাছে হটকেক। নাটকের গল্প মানেই যখন শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত পরিবার হয়ে যাচ্ছে, তখন বৃন্দাবন দাসের গ্রামকেন্দ্রিক চমৎকার গল্পে সালাউদ্দিন লাভলুর নির্মাণকে জীবন্ত করতে চঞ্চল চৌধুরী অতুলনীয় হয়ে উঠেছিলেন।

তবে এখানে খারাপ দিকটা হচ্ছে, নাটকগুলোর ভীষণ জনপ্রিয়তায় চঞ্চলের পিঠে ‘গ্রাম্য সহজ সরল যুবক’ চরিত্রের ট্রেডমার্ক পড়ে যাচ্ছিল। সবাই এ ধরণের গল্প নিয়েই চঞ্চলের কাছে আসছিল, মিডিয়ায় পায়ের নীচে শক্ত মাটি খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষায় চঞ্চলেরও না করার উপায় ছিল না। জনপ্রিয়তা, অভিনয়ের সুযোগ আর আকাঙ্ক্ষার এই ত্রিমুখী প্রতিযোগিতায় অনেকটা সময় নষ্ট করেছেন চঞ্চল অভিনয়জীবনের।
ভবের হাট, নিখোঁজ সংবাদ, তালপাতার সেপাই কিংবা হাড়কিপটে সিরিজের মতো টিভি নাটক আমরা যেমন পেয়েছি, তেমনি এরচেয়ে কয়েকগুণ বেশী নাটক পেয়েছি যেগুলো নিয়ে চঞ্চল নিজেও গর্ববোধ করেন বলে মনে হয় না।
তবে অপরাধবোধেও ভোগার কারণ নেই বোধহয়। প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ূন ফরীদির একটা কথা এখানে বলা যেতেই পারে, “যখন থিয়েটারে অভিনয় করতাম, রিক্সায় চড়তাম, টিভিতে অভিনয়ের পর ট্যাক্সিতে চলা শুরু করলাম, এখন বাংলা সিনেমায় গালিগালাজ করে নিজের গাড়িতে ঘুরি।” পেশাদারিত্বের জায়গায় ঠিক থাকতে গিয়ে কখনো কখনো ভালোবাসার জায়গায় ত্যাগ স্বীকার করে নিতেই হয়।
আরও পড়ুনঃ হুমায়ূন ফরীদি – খলনায়কের চরিত্রে নায়ক
সিনেমায় চঞ্চল এবং ইতিহাস
নাটকে পেশাদার হতে গিয়ে বাছবিচারহীন হতে হলেও সিনেমার ক্ষেত্রে চঞ্চল আপোষহীন শুরু থেকেই। এ কারণেই চঞ্চল চৌধুরী যে সিনেমাতেই অভিনয় করেছেন, সেখানেই সোনা ফলেছে। দর্শকপ্রিয়তার সাথে সাথে চঞ্চল অভিনীত সিনেমা সমালোচকদের কাছেও ভীষণ সমাদৃত।
আর সবার কাছে সমাদৃত চঞ্চলের অভিনয়। যে চরিত্রেই অভিনয় করছেন, সে চরিত্রের ভেতরে যেন তিনি একদম ঢুকে যান ওই সময়টুকু। আর তাই রূপকথার গল্পের বেকার যুবক যে রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া শিশুর প্রতি মায়াকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন দর্শকদের মনেও।

আবার গিয়াসউদ্দিন সেলিমের মনপুরা’র সোনাই আর পরীর প্রেম আর বিরহের কষ্টে যুগ পেরিয়েও দীর্ঘশ্বাস ফেলে দর্শকদের মনে। কিন্তু অশ্লীল সিনেমার স্বর্ণযুগে মনপুরার মতো নিখাঁদ প্রেমের সিনেমা সুস্থ দর্শকদের জন্য ছিল একটৃ প্রাণভরে নিশ্বাস নেবার জায়গা। ওপার বাংলার গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষ’ সিনেমায় প্রখ্যাত অভিনেতা প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জির সাথে পাল্লা দিয়ে সাবলীল অভিনয় করে গেছেন। টেলিভিশন সিনেমায় মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী তো অভিনয়ের ডুয়েল ব্যাটেল সৃষ্টি করেছিলেন এ সময়ের সেরা দুই অভিনেতা মোশাররফ করিম আর চঞ্চল চৌধুরীর মাঝে, দুজনই দুজনকে ছাপিয়ে গিয়েছেন একেক সময়।

আর সবকিছু ছাপিয়ে যাওয়ার ইতিহাস তৈরী করা চঞ্চল নিজেকেই ছাপিয়ে গেছেন অমিতাভ রেজা’র নির্মাণ ‘আয়নাবাজি’তে। একই সিনেমায় ছয় সাতবার আলাদা আলাদা চরিত্রে অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণকে। আর চঞ্চলের অভিনয় মানে তো শুধু চরিত্রায়ন নয়, চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়া। চমৎকার গল্প, নির্মাণ সবকিছুর পরও চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় আলাদা করে প্রশংসা কুড়িয়েছে সর্বমহলে। আর সিনেমা হিসেবে ‘আয়নাবাজি’ তো বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসই বদলে দিয়েছে একরকম।

চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত একমাত্র যে সিনেমা কিছুটা নেতিবাচক সমালোচনা কুড়িয়েছে, সেটি ‘দেবী’। হুমায়ূন আহমেদের ভীষণ জনপ্রিয় চরিত্র মিসির আলীকে পর্দায় উপস্থাপনের চ্যালেঞ্জ চঞ্চল পেরিয়েছেন, অভিনয়ের কমতি ছিল না কোথাও। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের মনে ভিন্ন ভিন্ন ইমেজ তৈরী হয়ে আছে মিসির আলী’র। সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব না, সেটা চঞ্চল নিজেও বুঝেছিলেন, তাই প্রথমে রাজী হতে চাননি চরিত্রটি করতে। পরবর্তীতে অবশ্য রাজী হয়ে যান চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েই।
তারপরও চঞ্চল চৌধুরী সিনেমায় অনন্য, পায়ের নীচে শক্ত মাটি তৈরীর চেষ্টায় মনের বিরুদ্ধে যেমন কাজ করতে হয়েছে অনেক নাটকে, সিনেমার ক্ষেত্রে তেমন আপোষ কখনো করেননি বলেই চঞ্চল চৌধুরীর সিনেমা মানেই এখন আমাদের কাছে ভালো সিনেমার আশ্বাস।
নাটকের হতাশায় ওটিটি’র ভরসা
প্রযোজকের চাহিদা, বিজ্ঞাপনদাতাদের চাপ, শিডিউল সল্পতা, ন্যুনতম বাজেট আর ভালো গল্পের অভাব, সবকিছু মিলিয়ে টেলিভিশন নাটকে ভালো কিছু পাওয়ার আশা এখন না করাই ভালো। তবে ভরসা দিচ্ছে দেশী বিদেশী বেশকিছু ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। বিজ্ঞাপনের ভিড়ে নাটক হারিয়ে যাওয়া টেলিভিশন নাটক থেকে চোখ সরিয়ে দর্শক ভালো কাজ পয়সা দিয়ে কিনে দেখছে, এরচেয়ে ভালো প্রাকটিস আর কী বা হতে পারে?

এক ঈদে চৌদ্দটা নাটকে অভিনয় করা চঞ্চলের মাঝে আমরা আমাদের প্রিয় অভিনেতা চঞ্চলকে খুঁজে পেতাম না। তিন দিনে এক-দেড় ঘন্টার নাটকের শ্যুটিং শেষ করলে সেখানে কাজ দেখানোর সুযোগই বা কোথায়?
কিন্তু ওটিটি’তে ভালো কাজের জন্য ভালো বাজেট পাওয়া যাচ্ছে, মেধাবী তরুণ নির্মাতারা আসছেন। সম্প্রতি এমনই এক তরুণ নির্মাতার ‘তাকদীর’ নামের নাটকে চঞ্চল চৌধুরী ও তার সহঅভিনেতাদের অভিনয় মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। আরো অনেক ভালো কাজ হচ্ছে।
‘আমাদের ড্যানজেল ওয়াশিংটন নেই কেন, আমাদের নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী কিংবা মনোজরা কোথায়‘ বলে আফসোস করা মানুষদের এই তরুণ নির্মাতারাই মনে করিয়ে দিক, আমাদের একজন চঞ্চল চৌধুরী আছেন।
References:
Feature Image: Punchforon
