পাল্প ফিকশন, কিল বিল এর মত দুরন্ত চলচ্চিত্র উপহার দেয়ার পর কুয়েন্টিন টেরেন্টিনো হাজির হয়েছিলেন নিজের দশম চলচ্চিত্র নিয়ে। পরিচালক হিসেবে তার মেধাকে প্রশ্ন করবে এমন সাধ্য খুব কম লোকেরই আছে। তবে যে কাজটি নিয়ে তিনি পরেরবারের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তাতে পরিচালনার দক্ষতার চাইতেও আরো বড় কিছু দরকার ছিল। হলিউডের সাড়া জাগানো এক ঘটনাকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলাটার সেই কাজে পরবর্তীতে পাশে পেয়েছিলেন দুই জীবন্ত কিংবদন্তীকে। ব্র্যাড পিট এবং লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও দুজন জুটি বেঁধে উপহার দিয়েছিলেন মনে রাখার মত এক মুভি। তবে প্রচন্ড সাড়া জাগানো সেই ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন হলিউড’ অ্যাকাডেমি পুরষ্কারটা অবশ্য নিজের করে পায়নি। পেয়েছিল সাড়া জাগানো কোরিয়ান চলচ্চিত্র প্যারাসাইট। এমনকি দারুণ অভিনয় করেও সেরা অভিনেতার অস্কার পাননি ডি ক্যাপ্রিও। জোকার চলচ্চিত্রের সুবাদে জোয়াকিন ফিনিক্স পেয়েছিলেন সেই সম্মান। তবে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের একমাত্র অস্কার এই চলচ্চিত্র গুণেই পেয়েছেন ব্র্যাড পিট। তবে আজকের গল্পটা প্যারাসাইট, জোকার কিংবা ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন হলিউড নিয়ে না। গল্পটা এক ক্ষ্যাপাটে খুনে পরিবারের নৃশংসতা নিয়ে।

ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন হলিউড
ওয়ান্স আপন আ টাইম চলচ্চিত্রটা দেখে থাকলে আপনি এতক্ষণে হয়ত জানেন না সেই রাতের মূল ঘটনা আর চলচ্চিত্রের মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। রবি মারগটের করা চরিত্র শ্যারন টেইটের সে রাতে মৃত্যু ঘটেছিল সিনেমার চার্লস ‘টেক্স’ ওয়াটসনের হাতে। উঠতি অভিনেত্রী শ্যারনই না কেবল, সেই রাতে আরো ৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল টেক্সের হাতে। শ্যারন টেইটের মৃত্যুর পর প্রায় ৫ দশক পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত পুরো হত্যাকান্ড ঘিরে জমে আছে অনেক অনেক লোককাহিনী, অনেক রহস্য। সবচেয়ে বড় কথা টেক্স আদতেই এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত কিনা সে নিয়েও আছে বড় প্রশ্ন।
কুয়েন্টিন টেরেন্টিনোর চলচ্চিত্রে শ্যারন টেইটের প্রতিবেশি রিক ডাল্টন (লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও) কে বাদ দিলে বাকি সবই বলতে গেলে বাস্তব জীবনের সাথে পরিপূর্ণ মিল ছিল। চলচ্চিত্রে দেখানো ঠিকানার মতোই ১৯৬৯ এর গ্রীষ্মে লস অ্যাঞ্জেলসের ১০০৫০ সিয়েলো ড্রাইভে বাস করতেন শ্যারন টেইট এবং তার স্বামী রোমান পোলানস্কি। শ্যারন টেইটের সবচেয়ে সফল চলচ্চিত্র ছিল ভ্যালি অফ দ্য ডলস (১৯৬৭)। ওই সময়ে একেবারেই উঠতি একজন অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। চলচ্চিত্রে বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনা হলেও মোটের উপর শ্যারন এবং পোলানস্কির জীবনটা সহজ সরলই ছিল।

বিটলস, হেলটার স্কেলটার এবং চার্লস টেক্স ওয়াটসন
চার্লস টেক্স ওয়াটসন সবশেষ যার কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন তিনি জেমস বাডি ডে। বাডি ডে পেশায় ক্রাইম টিভি রিপোর্টার। টেক্স যে ধর্মবিশ্বাস কিংবা কাল্টের প্রতি আসক্ত ছিলেন তা নিয়ে বইও লিখেছিলেন তিনি। ‘হিপ্পি কাল্ট লিডার: দ্য লাস্ট ওয়ার্ডস অফ চার্লস ম্যানশন’ বইতে তুলে এনেছেন খুনীর দেয়া স্বীকারোক্তি। জীবিত থাকা অবস্থায় চার্লস টেক্স ওয়াটসন সবশেষ স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন এই বাডি ডের কাছে।
টেক্সের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্যারন টেইট কিংবা সেদিন ওই বাড়িতে থাকা কাউকেই খুন করার কোন পরিকল্পনা তার ছিল না। বাডি ডে কে সে জানিয়েছিলো, ‘ওরা জানতো ওদের সাথে আমার কোন সম্পর্কই নেই।’ পরবর্তীতে বাডি ডে উল্লেখ করেছিলেন, ‘চার্লস ম্যানসনের ঘটনায় আরো অনেকেই জড়িত ছিল । কেউই কিন্তু জানেন না ঠিক কি হয়েছিল সেই রাতে। পুরো দলের মধ্যে কেউই এককভাবে কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি।’

বাডি ডে ছাড়াও আরো একজন চার্লস ‘টেক্স’ ওয়াটসনের পক্ষে কথা বলেছিলেন। তিনি ওই মামলার প্রসিকিউটর ভিনসেন্ট বাগলিওসি। বাগলিওসির কথায় পাওয়া যায় অন্য এক তথ্য। বিখ্যাত ইংলিশ রক ব্যান্ড বিটলসের অ্যালবাম ‘দ্য বিটলস’ (যা অনেক ক্ষেত্রে হোয়াইট অ্যালবাম নামে পরিচিত) দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন চার্লস। ওই অ্যালবামের হেলটার স্কেলটার গানের মাধ্যমে চার্লসের মনের মাঝে ব্যাপক এক পরিবর্তন দেখা দেয়। সে বিশ্বাস করতে শুরু করে, এই গানের মূল বার্তা ছিল, শ্বেতাঙ্গদের যেকোন অপরাধের ক্ষেত্রে কৃষাঙ্গদের দায়ী করা উচিত। এমনকি শ্যারন টেইটের ঘরে ‘পিগ’ শব্দটি ওই অ্যালবামের অন্য এক গান ‘পিগিস’ এর দিকে ইঙ্গিত করে বলেও ধারণা পোষণ করেন প্রসিকিউটর বাগলিওসি।
কেন এই হত্যাকাণ্ড
এই হত্যাকাণ্ড কেন সে বিষয়ে চলচ্চিত্রের পর্দায় আপনি যা দেখেছেন, তা আংশিক সত্য। ম্যানসন ছিলেন মূলত গানের প্রতি আসক্ত এক তরুণ, সেই সঙ্গে একজন ধর্মীয় নেতা। প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, ম্যানসনের নির্দেশেই চার্লস টেক্স সেই রাতে ওই বাড়িতে গিয়েছিল বাড়ির আগের মালিক টেরি মেলচারের উপর প্রতিশোধ নিতে। মেলচারের বাড়িতে একটি স্টুডিও করার ইচ্ছে ছিল ম্যানসনের। তবে ম্যানসন তাতে সাড়া না দিয়ে সে বাড়ি ভাড়া দেন শ্যারন টেইটকে। যদিও এই ঘটনা খুনী টেক্স কিংবা তার নির্দেশদাতা ম্যানসনের কেউই জানতেন না। আর তার ফল ভোগ করতে হয়েছিল শ্যারন টেইট সহ আরো ৫ জনকে।

বাডি ডে তার বইতে অবশ্য লিখেছেন অন্য এক কথা। ম্যানসন ছিলেন একজন হিপ্পি দলনেতা। নিজেকে সে ধর্মীয় একজন নেতা হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। নিজের অন্যান্য অনুসারীদের সাথেই লস অ্যাঞ্জেলসের স্পান র্যাঞ্চে থাকতেন এই নেতা গোছের মানুষটি। চলচ্চিত্রে এই জায়গাটিকেই দেখানো হয়েছে রিক ডাল্টনের অভিনয়ের সেট হিসেবে। চার্লস টেক্স ওয়াটসন ছিলেন সেই ম্যানসনদের একজন অনুসারী।
বাস্তব ঘটনা অনুযায়ী, ক্রো নামের একজন মাদকের ডিলারের সাথে আর্থিক লেনদেন বিষয়ে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন ম্যানসনরা। পরবর্তীতে সেই ডিলার ম্যানসনদের অনুসারী সকলের জন্যই হুমকি হয়ে উঠে। ম্যানসনের নির্দেশে পরবর্তীতে টেক্স সেই ডিলারকে খুন করে। এরমাঝেই গড়ে উঠে নতুন এক গ্যাং রাইভালরি। বেশ কিছু ঘটনাপ্রবাহের সূত্র ধরে পুলিশকে বিভ্রান্ত করতেই একইধরনের আরো কিছু পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটায় চার্লস এবং তার দল।

তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বক্তব্যটি মূলত এই দুয়ের মিশ্রণ। শ্যারন টেইট এবং রোমান পোলনস্কি যে বাড়িতে ছিলেন সেই বাড়িতে টেক্স এবং তার সঙ্গে ৩ জন গিয়েছিল মূলত বাড়িত মূল মালিককে খুন করতে। ম্যানসনের নির্দেশ ছিল পুরো বাড়িতে যাদেরকেই পাওয়া হবে তাদের সবাইকেই যেন খুন করে আসা হয়। ১৯৬৯ সালের ৮ অগাস্ট সেই লক্ষ্যেই ওই বাড়িতে যায় হিপ্পিদের ছোট দলটি। তবে ততদিনে সেই বাড়িতে টেরি মেলচার আর থাকতেন না। সেই সময় ওই বাড়িতে ছিলেন ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অভিনেত্রী শ্যারন টেইট, রোমান পোলানস্কির বন্ধু উওশেক ফ্রাইকোস্কি এবং তার বান্ধবী অ্যাবিগেইল ফলগার এবং সেই সময়ে বিখ্যাত হেয়ার স্টাইলিস্ট জেই সেব্রিন। সৌভাগ্যবশত রোমান পোলনস্কি সেই সময় ছিলেন ইউরোপে। পরবর্তী পোলানস্কির হাত ধরেই এসেছিল অলিভার টুইস্ট, চায়নাটাউন এবং দ্য পিয়ানিস্টের মত জনপ্রিয় বেশ কিছু চলচ্চিত্র।
বলা হয়ে থাকে, বিংশ শতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বুকে সবচেয়ে কুখ্যাত খুনগুলোর একটি ছিল এই ম্যানসন ফ্যামিলি হত্যাকান্ড। বেঁচে থাকলে শ্যারন টেইট যে আরো অনেকদূর যেতে পারতেন সে নিয়ে সন্দেহ করা চলে না। হয়ত সেই একটা আক্ষেপ থেকেই টেরেন্টিনো ডেকে এনেছেন রিক ডাল্টনের মত চরিত্র, অমর করে রেখেছিলেন উঠতি অভিনেত্রী শ্যারন টেইটকে।
This article is about Charles Mansion family killing. This killing inspired the making of the movie ‘Once upon a time in Hollywood’
References
- https://time.com/5633973/last-manson-interview/
- https://time.com/5635298/once-upon-a-time-in-hollywood-true-story/
Image: Times
