ফেসবুক হোক বা টুইটার, আজকাল যেকোন সোশ্যাল মিডিয়াতে গতানুগতিক পোস্ট বা ছবির থেকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে সেটা হচ্ছে “মিম”। তেমনি আমাদের দেশেও এই প্রকোপটা বাড়ে ২০১২ এর সময়ে। তখনকার সময়ে হালের জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম অভিনীত সিকান্দার বক্স নাটকটির কিছু সংলাপ বা ডায়লগটি স্থান দখল করে নেয় বাংলা ভাষভাষি মিম রাজ্যে। ডায়লগটি ছিলো ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায়, “কুইট্টালবাম তোরে”। ডায়লগটির সাথে মোশাররফ করিমের ছবি জুড়ে দিয়ে মিম বানানো হয়েছে অসংখ্যবার, শেয়ারও হয়েছে দেদারসে। তার সাথে যোগ হয়েছে বিভিন্ন মজার ক্যাপশন। বলা চলে, মিম এখন হয়ে উঠেছে নেটিজেন সংস্কৃতির একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ কিংবা হাল আমলের ভাষা বুঝার এক অনন্য মাধ্যম। নিব্বা-নিব্বি, গ্রাম্পি ক্যাট, ব্যাটম্যান স্ল্যাপিং রবিন, এসব মিম ফেসবুক ব্যবহার করেছেন অথচ দেখেননি তা তো হতেই পারে না।

এই মিম কিভাবে একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হল তা আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে। মিমের সংজ্ঞা কি? মিম অন্য যেকোন পোস্টের চেয়ে এত দ্রুত কেন ছড়ায়? শুধু একটা ছবির সাথে কিছু একটা লিখে দিলেই কি তা মিমের পর্যায়ে পড়ে? মিম এত দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব কেন ফেলে?

সমাজবিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স মিম শব্দটা প্রথম ব্যবহার করেন ১৯৭৬ সালে, তার “দ্য সেলফিশ জিন” বইতে। সেখানে তিনি বলেন যে, “সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান প্রাণীজ অভিযোজনের সাথে সমানুপাতে পরিবর্তন ও বিস্তার লাভ করে।“ তার মতে মিমও সংস্কৃতিরই একটা উপাদান। সেটা হতে পারে নতুন কোন আইডিয়া, ব্যবহার, কাজ বা স্টাইল যা একজনের মধ্য থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়ে। আর ছড়িয়ে পড়াটাকে আমরা নেটিজেনরা বলি ভাইরাল হওয়া। ভাইরাস ঘটিত রোগ যেমন দ্রুত ছড়ায়, সোশ্যাল মিডিয়ার বহুল ব্যবহারের কারণে যেকোন কিছুই খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রিচার্ড ডকিন্সের সংজ্ঞাটাকে আমরা একটু সহজ করে বলতে পারি এভাবে যে,
“মানুষের প্রচলিত আইডিয়া, ব্যবহার, কর্মকান্ড, পোশাক পরিচ্ছদ বা যেকোন কিছু, ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করলে সেটাকেই আমরা মিম বলি”।
আজকে মিম হাস্যরসাত্মক হবার পাশাপাশি, ব্যাঙ্গাত্মক, চিন্তামূলক এমনকি প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। সমাজের অরাজকতা, দুর্নীতি, অপরাধ, ক্ষমতার অপব্যবহার মিম খুব সহজেই ফুটিয়ে তুলতে পারে। একটা লেখা পড়তে আপনার একঘেয়ে লাগতে পারে, ভিডিওচিত্র দেখতে আগ্রহ নাও আসতে পারে। কিন্তু একটা মিম আপনার এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। এক লাইনের মধ্যে একটা ছবি এর দুই লাইন কথা লিখে দিলে আপনি একবার দেখলেই কাজ হয়ে যায়। আর আপনি যদি রিলেট করতে পারেন তার সাথে, তাহলে নিছক মজা করার জন্য হলেও, শেয়ার তো অবশ্যই করবেন। বন্ধুদের দেখাবেন, ট্যাগ দেবেন, ইনবক্স করবেন। ব্যস, চেইন রিয়্যাকশনের মত সেই মিমটা ছড়াতে শুরু করবে।

জোয়ি রথ হুট করেই মিমে পরিণত হয়। ২০০৫ সালের কথা। পাচ বছরের জোয়িদের বাসার কাছেই আরেকটা বাড়িতে আগুন লেগে যায়। ভয়ের কোন কারণ ছিল না, বাড়ির মালিক সেটা ফায়ার সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল। ফায়ার সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট তাদের নিয়মিত ড্রিলের অংশ হিসেবে বাড়িটায় আগুন লাগিয়ে দেয়। মোটামুটি উৎসবমুখর পরিবেশ। সেখানে জোয়ি আর তার ভাইও যায় বাবার সাথে। তাদের বাবা দুই ভাইবোনকে জ্বলতে থাকা বাড়ির সামনে দাড় করিয়ে ছবি তোলেন। কিছুদিন পর তাদের বাড়িতে জেপিইজি পত্রিকার একটা সংখ্যা আসে যাতে সেই বাড়ির সামনে দাঁড়ানো জোয়ির একটা ছবি ছিল। মুখে মুচকি হাসি। যেন সে কোন একটা দুষ্টুমি করে খুবই আনন্দিত।
আরও পড়ুনঃ পোকামাকড়ই কি তাহলে ভবিষ্যতের সুপারফুড!
ব্যস, সেই ছবি সময়ের সাথে মিমে পরিণত হয়৷ বিভিন্ন দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছবির সাথে তার হাসিমুখের ছবিটা বসিয়ে দেওয়া হয়। রাতারাতি ডিজাস্টার গার্ল বলে পরিচিতি পেয়ে যায় সে৷ তার ভাষ্য হচ্ছে, তার হাসিটাই অমন গা শিউরানো আর শয়তানিমাখা ছিল ছোটবেলায়।

কিন্তু মিম কিভাবে মিম হয়,
একটা ছবির সাথে কিছু একটা লিখে দিলেই কি তা মিমের পর্যায়ে পড়ে? মিম টেমপ্লেট বা মিম মেকিং অ্যাপগুলো যাই বলুক না কেন উত্তর হবে, না। একটা মিম তখনই মানুষের মনে দাগ কাটবে যখন তার সাথে মানুষ নিজের জীবন বা আশেপাশে দেখা কোন ঘটনা মেলাতে পারবে। শোনা বা পড়ার তুলনায় দৃশ্যমান যেকোন কিছু মানুষের স্মৃতিতে বেশি সময় ধরে থাকে। আপনি একটা ছবির সাথে কৌতুক জুড়ে দিলেই হবে না। মনে করুন আপনি প্রথমবার কোন সিরিজ দেখতে বসেছেন, রাতের বেলা, বাসার সবাই গভীর ঘুমে আপনি গভীর মনোযোগে সিরিজ দেখছেন, এক এপিসোড শেষ হতে আপনার মনে হল, অনেক রাত হয়েছে, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন রাত তিনটা। এখন ঘুমানোর দরকার। কিন্তু আপনার মন বলতে থাকবে, আরেকটা এপিসোড, আরেকটা এপিসোড দেখি, ওটা দেখেই ঘুমাব। এভাবে এপিসোডের পর এপিসোড যাবে, ঘুম আর আসবে না। আপনি সিরিয়ালখোর হয়ে থাকলে এইটা আপনার রোজ রাতেরই কাহিনী। এবার দেখুন কারমিট দ্য ফ্রগের এই মিমটা আপনার সাথে যায় কি না?

এখানে মোদ্দা কথাটা হল আপনি একটা মিম শেয়ার করবেন না বা তা আপনার মনে দাগ দেবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সেটার সাথে আপনি নিজেকে বা পরিচিত কাউকে রিলেট করতে পারছেন।

সাকসেস কিড স্যামের গল্পটাও জোয়ির মতই। ১১ মাসের স্যাম তার মা বাবার সাথে বীচে ঘুরতে যায়। সেখানে এক মুঠো বালি সে মুখে পুড়ে ফেলে। তার মা বিষয়টায় মজা পেয়ে তার আরেকটা ছবি তোলেন, সেখানে সে আরেক মুঠো বালি মুখে পুরছিল। এই ছবিটা তার মা ফ্লিকার অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করেন। ব্যস। রাতারাতি মিমে পরিণত হয় ছবিটা আর স্যাম পরিণত হয় সাকসেস কিডে।

মিম ভাইরাল কেন হয় দ্রুত, এর উত্তরও রিচার্ড ডকিন্স দিয়ে গেছেন, “যেকোন মিম ছড়ায়, নকল হয় বা অনুকরণ- অনুসরণ করা হয় কারণ তার পেছনে তিনটা বৈশিষ্ট থাকে, সেগুলো হল,
- মিমের বিষয় বস্তু কতটা নকল করা সম্ভব। মিম নকল করা বলতে এখানে একই বিষয় একটু ভিন্নভাবে উপস্থাপন, বা যে প্রশ্নটা মিমে আছে সেটা কতটা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য বা রিলেটেবল।
- কত দ্রুত এটাকে ছড়ানো হচ্ছে।
- এটা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে।
সামাজিক বা রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে বানানো মিমগুলোর স্থায়িত্ব বেশি হয় একটা কারণে, সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেই মিমে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হয়েছে। যেমন বি লাইক বিল মিমগুলোতে অনলাইনের বিভিন্ন অসঙ্গতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।

প্রশ্নগুলোর সমাধান যতদিন না হচ্ছে অন্তত ততদিন মিমগুলো টিকে থাকবে। আর সাইবারওয়ার্ল্ডে কিছু আপলোড একবার হলে তা কখনও খোয়া যায় না।
দিন শেষে আমরা মিম সংস্কৃতির প্রতি কৃতজ্ঞ। দিন শেষে যখন বিরিয়ানি বিষয়ক কোন মিমে নিজের বন্ধুকে ট্যাগ করেন, বা স্কুল থেকে ফিরে স্কুল বা পড়াশোনা বিষয়ক কোন মিম দেখে আপনার মুখে যদি হাসি ফোটে তাহলে সেখানেই মিমের স্বার্থকতা। মিম আপনাকে হাসাবে, ভাবাবে, নস্টালজিক করবে, সর্বোপরি আপনার কথাটাকে পৌছে দেবে অন্য কিংবা অনেকের কাছে।
Reference:
- Most popular internet memes in history
- Zoë Roth sells ‘Disaster Girl’ meme as NFT for $500,000
- Why Are Some Memes Funny While Others Fall Flat?
Feature Image: Punchforon
