এলআরবি’র পারফর্ম করার কথা রংপুর জেলা স্কুল মাঠে, ২০০৪ সালে। ঠিক তার আগের রাত থেকে কনসার্টের দিন প্রায় দুপুর পর্যন্ত এমন তুমুল বৃষ্টি যে জেলা স্কুলের বিশাল মাঠ বৃষ্টির পানিতে টইটুম্বুর। বিরূপ আবহাওয়ার জন্য প্লেনের টিকেট না পেয়ে এলআরবি এসেছে বাই রোডে। এত কষ্টের জার্নি শেষে যখন ভেন্যুতে হাঁটুপানি জেনে সবাই হতাশ কনসার্ট হবে না ভেবে, তখনই অরগানাইজারদের একজন এসে খবর দিলো অবাক করা এক খবর। হাজারের উপরে মানুষ, কেউ প্যান্ট ফোল্ড করে, কেউ লুঙ্গী গুটিয়ে আবার কেউ সব ভিজিয়েই পানিতে দাড়িয়ে, এলআরবি’র গান আর আইয়ুব বাচ্চুর গিটারের মূর্ছনায় মাতাল হওয়ার অপেক্ষায়।

এলআরবি সেদিন কনসার্ট করেছিল। পায়ে পায়ে পানি উঠে স্টেজও ভিজে গিয়েছিল, এমপ্লিফায়ারে ইলেকট্রিক শক করছিল মাঝে মাঝেই, তবু কনসার্ট হয়েছিল। আইয়ুব বাচ্চুর গিটার আর গান-সুরের মূর্ছনায় রংপুরের মানুষ ভুলে গিয়েছিল সারাদিন বৃষ্টির পানিতে ভিজে দাড়িয়ে থাকার কষ্ট।
এমন অসংখ্য গল্প আছে আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে। খুলনায় শো করতে গিয়ে রাত তিনটায় স্টেজে উঠে ভোর দেখেছেন, স্টেজ থেকে যখন নামছেন তখন ঘড়িতে সকাল সাতটা, আর মাঠভর্তি বিমুগ্ধ শ্রোতা তখনো ক্লান্তিহীন চ্যান্ট করে যাচ্ছে এবি আর এলআরবি’র নামে। একুশে টিভির ফোনো লাইভে সারারাত ধরে টানা এগারো ঘন্টা গান করা আর গিটার বাজানোর রেকর্ডও তার আছে।
স্বাধীনতা পর্রবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম শহর যখন ব্যান্ড মিউজিকের আতুর ঘর, এমনি একটা সময়ে চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা আইয়ুব বাচ্চুর। সোলস তখন বেশ নামকরা ব্যান্ড শহরে, হোটেল রেস্টুরেন্টে বাজিয়ে বেড়ায়। তাদের দেখাদেখি কিশোর আইয়ুব বাচ্চুরা গোল্ডেন বয়েজ নামের একটি ব্যান্ড গঠন করে। সামাজিক অনুষ্ঠানে ইংরেজি গানের কাভার করে বেড়ানো ব্যান্ডটির মেম্বারদের ওয়েস্টার্ন ড্রেসআপ, এটিচিউড আর বড় চুলের জন্য মুরুব্বীশ্রেণীর মানুষজন গোল্ডেন বয়েজকে ‘আগলি বয়েজ’ বলে ডাকতে শুরু করে। রাগ নয়, বাচ্চুরা বরং একসময় পছন্দই করে ফেলে নামটা, পরবর্তী শো’গুলোও তাই আগলি বয়েজ নামেই করতে থাকে।

আগলি বয়েজে’র পর ফিলিংস গঠন করেন, এখানে আইয়ুব বাচ্চুর সাথে রিফ গিটারে জয়েন করেন পরবর্তীতে আরেক রকস্টার হয়ে ওঠা মাহফুজ আনাম জেমস। চট্টগ্রামের বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে ইংরেজি গান কাভার করতো ব্যান্ডটি। এদিকে সোলস তখন তাদের এ্যালবামের কাজ শুরু করবে, প্রয়োজন ছিল গিটারিস্টের। ফিলিংস গঠনের কিছুদিনের মধ্যেই সোলসে গিটারিস্ট হিসেবে বাজানোর অফার আসলে জেমসদের কাছে ফিলিংস ছেড়ে দিয়ে আইয়ুব বাচ্চু জয়েন করেন সোলসে। ফিলিংস ব্যান্ড থেকেই পরবর্তীতে এসেছে ফান্টির মতো দেশসেরা ড্রামার, বেসবাবা সুমনের মতো বিশ্বখ্যাত বেজিস্ট, আর গুরু জেমস তো আছেনই, সে গল্প আরেকদিন হবে।
দীর্ঘ দশ বছর সোলসে বাজানোর পর আইয়ুব বাচ্চু সোলস থেকে বেরিয়ে এসে নিজের সলো এ্যালবাম ‘ময়না’র কাজ শুরু করেন। এ্যালবামটি ভীষণ জনপ্রিয় হওয়ার পরও আইয়ুব বাচ্চু এলআরবি গঠন করেন, ব্যান্ড যে তার রক্তে। প্রথমে লিটল রিভার ব্যান্ড নামে যাত্রা শুরু করলেও ওয়ার্ল্ড কপিরাইট ইস্যুর ঝামেলা এড়াতে তা ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড ‘ হয়ে যায়।

গিটারে ডিসটর্শন ব্যবহার করতে না পারার অক্ষেপে সোলস থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু, এলআরবি’র প্রথম এ্যালবামগুলোতে ডিসটর্টেড সাউন্ড নিশ্চয়ই তাকে মানসিক শান্তি এনে দিয়েছিল, আর বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিকের শ্রোতারা পরিচিত হয়েছিল মিউজিকের সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়ের সঙ্গে। গিটারের সেই ‘ঝ্যা ঝ্যা’ আওয়াজে পরবর্তী প্রজন্ম যে কতটা উন্মাদনায় মেতেছিল, তা বর্তমানের হার্ড রক ও মেটাল মিউজিকে গিটারের সাউন্ডে বাংলাদেশের রিভ্যুলিউশনেই বোঝা যায়।
শুধু ডিসটর্শনই নয়, লাইভ গিটার-ড্রামসের প্রোপার সেটআপে লাইভ মিউজিকের ধারণা বাংলাদেশকে হাতে ধরে জোর করে শিখিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চুই। এলআরবি’র আগে পর্যন্ত ঢাকার বাইরের মানুষের কাছে ভোকালই ছিল সর্বেসর্বা, অরগানাইজাররাও তাই কম বাজেটের ইস্যু তুলে শুধু ভোকালকে নিয়েই অনুষ্ঠান চালিয়ে দিতে চাইতেন। আইয়ুব বাচ্চুই প্রথম অরগানাইজারদের চাপ দিতে শুরু করেন, ডাকলে পুরো ব্যান্ডকে ডাকতে হবে, স্টেজে ফুল ব্যান্ডের সেটআপের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

লাইভ ড্রামসের বিট আর গিটারে সুরের মূর্ছনায় বাঙালী খুব দ্রুত অনুভব করতে শুরু করে সত্যিকারের মিউজিকের ম্যাজিক। আইয়ুব বাচ্চুর প্রায় একা হাতে করা এই আন্দোলন ব্যান্ড মিউজিকে এমন এক রিভল্যুশনের শুরু করেছিল, যার ফলে পরবর্তীতে তরুণ ব্যান্ডগুলো অনেক ডেডিকেটেড মিউজিশিয়ানের জন্ম দিতে পেরেছে।
শুধু গান কিংবা গিটার নয়, অন্য ইনস্ট্রুমেন্টেও ছিল তার যাদুকরী দক্ষতা। একবিংশ শতাব্দীতে এলআরবি’র এ্যালবামগুলোর অনেক গানেরই ড্রামস কম্পোজিশন, বেজলাইন তার নিজের করা। এমনকি কনসার্টের আগে সাউন্ড চেকে অনেক মিউজিশিয়ানই তাকে ড্রামস থ্রোনে বসতে দেখেছেন, সেখানেও তিনি ছড়িয়েছেন সমান মুগ্ধতা৷ প্রকৃতপক্ষে, আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মিউজিশিয়ান।
আইয়ুব বাচ্চুর প্রতিভা ঈশ্বরপ্রদত্ত, তবে মিউজিকে তার প্যাশনও যে অসম্ভব পর্যায়ের, তা তার সমসাময়িক বন্ধু মিউজিশিয়ানদের গল্প শুনলে বোঝা যায়। আরেক লিজেন্ডারি গায়ক কুমার বিশ্বজিৎ একই সময়ে বেড়ে উঠেছেন আইয়ুব বাচ্চুর সাথে, এমনকি বিশ্বজিৎ ঢাকায় শিফট করার পরও তাদের বাসায় বাচ্চুর অবাধ বিচরণ ছিল, ঢাকায় আসলে উঠতেনও সেখানে৷ বিশ্বজিৎ খুব কাছে থেকে দেখেছেন কিভাবে রাতের পর রাত গিটার নিয়ে পার করে দিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু।
কুমার বিশ্বজিৎ আর আইয়ুব বাচ্চুর একই সাথে এক বন্ধুর বিয়ের দাওয়াতে যাওয়ার কথা, শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসলেন বাচ্চু যাবেন না বলে। বিশ্বজিৎ সন্ধায় বেরিয়ে গিয়ে সারারাত বন্ধুর বিয়েতে মজা করে সকালে যখন ফিরেছেন, বাচ্চু ঠিক একই জায়গায় বসে আছেন, গিটার বাজাচ্ছেন। এমন তীব্র গিটারের নেশায় মত্ত ছিলেন তিনি। আর এমন হাজারো গল্প শোনা যায় নাসিম আলী খান, ফুয়াদ নাসের বাবু, লাবু রহমান, তপন চৌধুরীদের কাছ থেকে।
ফিডব্যাকের লাবু রহমান তো সরাসরিই বলেন, “কেউ যদি বাচ্চুর গানগুলোই শুধু গিটারে তুলে অনুভব করে বাজাতে থাকে, তাহলে তার কোন ইন্সটিটিউট প্রয়োজন নেই, তাকে গ্রাজুয়েট ঘোষণা করা যায়৷ যে কোন নতুন গিটারিস্টের জন্য আইয়ুব বাচ্চুর এক একটা সলো রীতিমতো টেক্সটবুক। “
শুধু গিটারই বা বলি কেন, মিউজিকে সব ধরণের স্বাদের খোঁজ দিয়ে গিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু। সেই তুমি, রূপালী গিটারের মতো জনপ্রিয় গান যেমন আছে, তেমনি হকার, রিটায়ার্ড ফাদারের কনসেপ্টচুয়াল গানে ফিলোসোফি তৈরী করেছেন। বারো মাস তোমায় ভালবাসির মত গান দিয়ে মফস্বলের ছেলেটার কাছে যেমন প্রিয় মুখ হয়েছিলেন, তেমনি ঘুমন্ত শহরে কিংবা চাঁদ মামা’র মত মেটাল ফিলের গান করে মেটাল হেডদের কাছেও আইয়ুব বাচ্চু অনুকরণীয়।
জিমি হেন্ডরিক্স, জো স্যাট্রিয়ানিদের অনুপ্রেরণায় গিটার বাজাতে শুরু করা আইয়ুব বাচ্চু নিজে প্রায় বলতেন আরেক প্রিয় গিটারিস্ট ডেভিড গিলমোরের কথা, ‘এই লোকটা তার গিটারের একটা পুল দিয়ে পুরো গানকে টেনে নিয়ে যেতে পারে!’ অথচ এটা বলতে বলতে আইয়ুব যে তার গিটারের মেলোডিতে শুধু গান না, অন্তত তিনটি প্রজন্মকে তার কাছে টেনে নিয়েছিলেন, প্রিয় মিউজিশিয়ানের সাথে সাথে প্রিয় মানুষও হয়ে উঠেছিলেন, সে খবর কি তিনি জানতেন?

নতুন অনেক ব্যান্ডের প্ল্যাটফর্ম দেয়াতেও আইয়ুব বাচ্চু বাংলাদেশের অদ্বিতীয় একজন। একসময় ‘এবি কিচেন’ হয়ে উঠেছিল তরুণ মিউজিশিয়ানদের আড্ডাস্থল৷ ভাইকিংস, ব্ল্যাক, শিরোনামহীনের মতো এখনকার ব্যান্ড মেম্বারদের কাছে আইয়ুব বাচ্চুর সাথে সময় কাটানো ছিল তখন স্বপ্নের মতো।
মগবাজারের বাসা থেকে আইয়ুব বাচ্চু বেরুবেন, গাড়ি থেকে হাত নাড়বেন বলে অনেক ভক্ত বসে থাকতেন সেখানে। শুধু হাতই নাড়েননি, আইয়ুব বাচ্চু প্রায়ই গাড়ি থেকে নেমে তাদের সাথে কথা বলতেন, হাত মিলিয়ে বুকে টেনে নিতেন আর ছবি তুলতেন। ছবি তোলার এই এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল আইয়ুব বাচ্চুর। ফ্যানদের সাথে এত বেশী ছবি তুলেছেন যে মাঝে মাঝে মনে হয়, বাংলাদেশের অর্ধেক মানুষের বুঝি আইয়ুব বাচ্চুর সাথে ছবি আছে। পরিচিত মিউজিশিয়ানদের সাথেও দেখা হলে নিজে ডেকে ছবি তুলে রাখতেন।
এমন আনন্দমুখর মানুষটা জীবনের শেষ দিকে কোন এক অদ্ভুত অজানা কারণে প্রচন্ড অভিমানী হয়ে উঠেছিলেন। আইসোলেটেড থাকতেন, প্রায়ই বলতেন তার কিছু ভালো লাগছে না, তিনি গিটার নিয়ে বেরিয়ে পড়তে চান, জীবনের বাঁধা ধরা দায়িত্বের শেকল থেকে মুক্তি খুঁজে বেড়াতেন। মুক্ত হতে খুব বেশী দেরীও করেননি, রূপালী গিটার ছেড়ে সত্যিই দূরে চলে গেছেন।
ডিপ্রেশনের চরম পর্যায়ে থেকেও এবি নতুন মিউজিশিয়ানদের জন্য দিনের পর দিন গলা তুলেছেন। বারবার কপিরাইট ইস্যু নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন, দেশী ব্যান্ডের জন্য স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম তৈরী করতে লড়াই করে গেছেন সরকার, কর্পোরেট থেকে শুরু করে সামাজিক সিস্টেমের সাথে। গত সাত বছর ধরে নিয়মিত ভাবে ‘ব্যান্ড ফেস্ট’ আয়োজনও তার হাত ধরেই শুরু। আইয়ুব বাচ্চু নিজের জন্মদিনে তারকাকথন অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে গিয়ে চ্যানেল আই কর্ণধার ফরিদুর রেজা সাগরকে অনুরোধ করেন বছরে অন্তত একটা দিন যেন শুধু ব্যান্ড এবং ব্যান্ডপ্রেমীদের জন্য রাখা হয়। এবি’কে দেয়া কথার প্রেক্ষিতেই চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে প্রতি বছর পহেলা ডিসেম্বর আয়োজন করা হয় ব্যান্ড ফেস্টের।
সারাজীবন ধরে যে সংগ্রাম আইয়ুব বাচ্চু করে গেছেন, তা বৃথা যায়নি। রাঙ্গামাটির প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন পাওয়ারসার্জ কিংবা ট্রেইনরেকের মতো থ্রাশ মেটাল ব্যান্ড ফুল সেটআপে লাইভ শো করে। ব্যান্ড ফেস্ট হচ্ছে প্রতিবছরই আরো বৃহৎ পরিসরে। আর কপিরাইট ইস্যু নিয়ে সোচ্চার হওয়া আইয়ুব বাচ্চুর ব্যান্ড এলআরবি’র সব গান সরকারীভাবে আর্কাইভ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের যে কোন মিউজিশিয়ানের জন্য এমন সরকারী উদ্যোগ এটাই প্রথম। এ উদ্যোগ ছড়িয়ে যাক সকল মিউজিকের জন্য। আইয়ুব বাচ্চু এবং আইয়ুব বাচ্চুর মতো শিল্পের পেছনে জীবন বিলীন করে দেয়া সকল আর্টিস্ট বেঁচে থাকুক তাদের সৃষ্টির মধ্যে।
This Article is about the iconic Bangladeshi pop singer, guitarist, and songwriter Ayub Bachchu.
Reference:
Feature Image Credit: The Asian Age.
