পাড়া মহল্লার চায়ের দোকানগুলোতে ‘চায়ের কাপে ঝড়’ ব্যাপারটার সাথে হয়তো আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। কিংবা ছোটবেলায় Phrase and idioms পড়তে গিয়ে ‘Storm in a tea cup’ নিশ্চয়ই পড়েছেন। খেলাধুলা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনার একপর্যায়ে তুমুল যুদ্ধ হরহামেশাই ঘটে থাকে। তবে এ যুদ্ধ কথার কথা হলেও, ইতিহাসে চা কে কেন্দ্র করে যে সত্যিকার অর্থেই এক ভয়ংকর যুদ্ধের সূচনা ঘটেছিলো, সে গল্প হয়তো এতটা পরিচিত নয়। কিন্তু নামটা বেশ পরিচিত, আফিম যুদ্ধ। চীন এবং ব্রিটেনের মাঝে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের অন্যতম এক বিতর্কিত যুদ্ধ। আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় এটিই।
আফিম যুদ্ধের পেছনে শুধুমাত্র চা-কে একতরফা ভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না। অনেকগুলো ছোট ছোট ঘটনার ফলাফল এ যুদ্ধের মহল তৈরি করতে সহায়তা করেছিলো। ঘটনার সূত্রপাত ১৮ শতকের শেষদিকে। ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে ইউরোপিয়ানদের কাছে চীনের পোর্সেলিন, সিল্ক এবং চায়ের চাহিদা ছিলো প্রচুর পরিমাণে। বিশেষ করে চা। কিন্তু বিনিময়ে অন্য দেশের পণ্যের বিষয়ে চীনাদের কোনো আগ্রহ ছিলনা। সুতরাং, এখানে এক অসম ব্যবসায়ের সূত্রপাত ঘটে।
যেহেতু চীনকে দেওয়ার মতো ব্রিটিশদের কাছে অন্য কোনো পণ্য ছিলো না, সেহেতু চায়ের বিনিময়ে চীন সিলভার কয়েন দাবী করে বসে। কেননা চীনে শুধুমাত্র সিলভারেরই অপ্রতুলতা ছিল। ধীরে ধীরে ব্রিটিশদের রাজকোষ ফাঁকা হতে শুরু করে। এছাড়া, সম্পূর্ণ চীনের শুধুমাত্র একটা বন্দরে ব্রিটিশদের বাণিজ্য করার অনুমতি ছিল – ক্যান্টন। সবকিছু মিলিয়ে ব্রিটিশদের আসলেই পোষাচ্ছিল না। তাদের টার্গেট ছিলো, যেভাবেই হোক চীনের এই বিশাল বাজার দখলে আনতে হবে। তো তারা এক অভিনব উপায় বের করে, যা তাদেরকে বানিয়েছিলো ইতিহাসের ভয়ংকর এক মাদক ব্যবসায়ী।

সেসময় বাংলার মাটিতে শাক সবজির পাশাপাশি আরও একটা জিনিস খুব ভালোভাবে চাষ করা সম্ভব ছিলো, সেটা হলো পপি। এই পপির বীজ থেকে পাওয়া যেত আফিম, যা মরফিন এবং হেরোইন-এর প্রধান উপকরণ। তো ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি এই আফিম বিক্রি শুরু করে চীনে। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় চীনের কঠোর নিয়মনীতি। চীনে আফিমকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। ফলে ব্রিটিশদের নিতে হয় অন্য এক পথ। মাদক পাচার। ধীরে ধীরে চীনের সৈনিক থেকে শুরু করে সাধারণ জনগন আফিমে আসক্ত হতে থাকে এবং আফিমের চাহিদাও বাড়তে থাকে।
আফিম থেকে ব্রিটিশরা যে লাভ পেত আবার সেটা ব্যবহার করেই চীনের কাছ থেকে চা কিনতে শুরু করে তারা। সব মিলিয়ে চীনের রাজা এ ব্যাপারে খুবই ক্ষুব্ধ হন। তিনি চীন থেকে সকল ধরণের আফিম নষ্ট করে ফেলার নির্দেশ দেন। তার আদেশেই ক্যান্টন বন্দরে প্রায় ১.২ মিলিয়ন কেজি আফিম নষ্ট করে ফেলা হয় বা সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ব্রিটিশ আফিম ব্যবসায়ীরা বেশ ক্ষুব্ধ হয়। ধীরে ধীরে চীন এবং ব্রিটিশদের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটতে থাকে।

ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে ১৮৩৯ সালের দিকে ব্রিটিশরা চীনের সাথে যুদ্ধ আরম্ভ করে। এটাই প্রথম আফিম যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৮৩৯ থেকে ১৮৪২ পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলমান ছিলো। আফিমের নেশায় আসক্ত চীনা সেনাবাহিনী ব্রিটিশদের সামনে বলতে গেলে দাঁড়াতেই পারেনি। প্রথম আফিম যুদ্ধে চীনের পরাজয় ঘটে খুব সহজেই। যদিও এত সহজে এ ঘটনা ব্যাখ্যা করা বেশ মুশকিল। এ যুদ্ধের ঘটনা বেশ জটিল এবং বিতর্কিত। ১৮৪২ সালের ২৯ আগস্ট নানকিং চুক্তির মাধ্যমে প্রথম আফিম যুদ্ধের অবসান ঘটে। এ চুক্তি অনুসারে ব্রিটিশদেরকে চীন সিলভার কয়েনে ২১ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেয় এবং সেই সাথে ক্যান্টনের পাশাপাশি আরও ৪ টি বন্দর বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হয়। এভাবে চীনের একচেটিয়া ব্যবসার অবসান ঘটে। কিন্তু এত কিছুর পরেও ব্রিটিশরা আফিম ব্যবসাকে চীনে বৈধতা দিতে পারেনি। ফলে আরও কয়েক বছর ধরে চলে আফিমের অবৈধ চোরাচালান, যা দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলো।

প্রথম আফিম যুদ্ধের চুক্তিতে ব্রিটিশরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিল না। পরবর্তীতে তাদের সাথে আরও যোগ দেয় ফ্রান্স এবং আমেরিকা। তারা একসাথে হয়ে ১৮৫৬ সালের দিকে চীনের কাছে চুক্তি সংশোধনের দাবী জানায়। কিন্তু চীন কোনোভাবেই আবার চুক্তি সংশোধনের ব্যাপারে রাজি হয়না। ফলে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হতে শুরু করে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি চূড়ান্ত পরিণতি পায় ‘arrow’ নামে একটি ছোট্ট জাহাজকে কেন্দ্র করে। জাহাজটি মূলত ছিলো চীনা জাহাজ। কিন্তু জাহাজটি হংকং এর এক ব্রিটিশ কম্পানির কাছে রেজিস্ট্রিকৃত ছিলো। ফলে জাহাজে ব্রিটিশ পতাকা লাগানো ছিলো। ঐ বছরই ৪ঠা অক্টোবর এক কুখ্যাত জলদস্যু ধরতে গিয়ে ৪ জন চীনা অফিসার ৬০ জন সৈন্যসমেত ঐ জাহাজে উঠে পড়ে। ধস্তাধস্তিতে জাহাজে থাকা ব্রিটিশ পতাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই ঘটনাকে অজুহাত বানিয়ে ব্রিটিশরা পতাকা অবমাননার দায়ে চীনকে ক্ষমা চাইতে বলে। কিন্তু চীন এ ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানায়। এবং ফলাফলস্বরূপ শুরু হয় দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ। এ যুদ্ধে ফ্রান্সও এগিয়ে আসে ব্রিটিশদের সাথে এবং আবারও চীনের পরাজয় ঘটে। চীনের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটার পরে তারা নতুন চুক্তি করতে বাধ্য হয়। এ চুক্তিতে চীনকে আরও কিছু সমুদ্রবন্দর ছেড়ে দিতে হয় এবং এতদিন ধরে ব্রিটিশরা যে কারণে যুদ্ধ করে গেল সে আশা পূরণ হয় শেষ পর্যন্ত। অবশেষে নতুন চুক্তিতে চীনে আফিম বাণিজ্য বৈধ ঘোষণা করা হয়।

অনেকের মতে আফিম যুদ্ধের পেছনে আফিম ছিল একটা অজুহাত মাত্র। মূলত চীনের ওপর ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবেরই প্রতিফলন হিসেবে শুরু হয়েছিলো এই আফিম যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলাফলে চীনকে উন্মুক্ত করেছিলো পুরো বিশ্বের বাজারে। কিন্তু চীনাদের কাছে এ যুদ্ধের ফলে করা চুক্তিগুলো ছিলো বড়ই অপমানের। চীনের ইতিহাসে এ ঘটনাকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘Century of humiliation’ হিসেবে।
তো আফিম যুদ্ধের এই বিতর্কিত ইতিহাস হয়তো আজও কোনো চায়ের দোকানে ‘চায়ের কাপে ঝড়’ তোলার মত বিষয়বস্তু। কিংবা সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চায়ে একটু চুমুক দিয়ে আপনিও ভাবতে পারেন, ‘যদি আফিম যুদ্ধ না হতো, তাহলে আপনার হাতের এক কাপ চা কি এতো সহজে আপনার আপনার হাত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতো?’
This Bangla Article is about one of the most controversial wars in history between China and Britain.
Resources:
- The Opium Wars
- The Opening to China Part I
- The Opening to China Part II
- How Britain Went to War With China Over Opium
Feature Image: The Guardian
