মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসবের নাম ইদ ৷ নানা আয়োজন এবং ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্য্যতার ভেতর দিয়ে বছরে দুইবার মুসলমানেরা ইদ উদযাপন করে থাকেন ৷ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে চাঁদ রাত থেকেই ইদের উদযাপন শুরু হয় ৷ পটকা ফুটিয়ে,গান বাজিয়ে শুরু হওয়া এই আবহে নতুন মাত্রা যোগ করে ইদ সালামী, হাতে মেহেদি দেওয়া, সুস্বাদু খাদ্য পরিবেশন রীতির ঐতিহ্যবাহী ঘটনা ৷

এ দেশে ইদ যে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত উৎসবের ঘটনা— তা কিন্তু নয় ৷ পাড়া-প্রতিবেশি থেকে শুরু করে সমাজের একদম অসহায় মানুষ পর্যন্ত পারস্পারিক সহযোগীতায় আনন্দপূর্ণ সময় উপভোগের মানবিক ঘটনা ইদ ৷
সারা পৃথিবীতে একই নিয়মে ইদ উদযাপিত হয় না ৷ বরং পৃথিবীর মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো নিজেদের মত করে নানা বৈচিত্রপূর্ণ ঘটনায় যার যার ইদ উদযাপন করে থাকে ৷
চলুন, জেনে আসা যাক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কিভাবে ইদ উদযাপন করা হয়ে থাকে ৷
মিশর
মিশর পৃথিবীর ইতিহাসে এক ঐতিহ্যবাহী নাম ৷ ইদ উদযাপনকে ঘিরে এখনো পর্যন্ত তারা তাদের পুরনো ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে৷
ইদ ঘনিয়ে আসলেই মিশরের বেকারিগুলোতে ‘খ্বাক’ কেনার ধুম পড়ে যায় ৷ ‘খ্বাক’ এক ধরনের মিশরীয় কুকিজ, যা বাদাম এবং চিনি দিয়ে তৈরি করা হয় ৷ পরিবারের সবার সাথে ‘খ্বাক’ খাওয়ার আয়োজন দিয়েই মিশরে মূলত ইদের আনন্দ শুরু হয় ৷

ইদের নামাজের শুরুতে ইদ এর মাহাত্ম্য এবং শিক্ষা সমন্ধে আলোচনা করা হয় ৷ তারপর নামাজ শেষে গোটা মিশর পরিণত হয় এক আনন্দ উদ্যানে ৷ সব বয়সীদের ভেতর কোলাকুলি করে শুভেচ্ছা বিনিময় ইদের দিনে মিশরের সাধারণ দৃশ্য ৷
মিশরে ইদের সময় বড়রা ছোটদেরকে ‘ইদিয়াহ’ নামে অর্থ উপহার দেওয়ার রীতি আজও চালু রেখেছেন ৷ ইদের দিন মিশরের প্রতিটি বাসাই প্রতিবেশী, আত্মীয়দের মিলনমেলায় পরিণত হয় ৷ দলবেধে ঘুরতে বের হওয়াও মিশরীয় ইদ উদযাপনের প্রসিদ্ধ রীতি ৷ সেই কারনেই ইদ উপলক্ষে নীলনদের তীর, গিজা চিড়িয়াখানায় চোখে পড়ার মত দর্শনার্থীদের ভিড় জমে থাকে ৷
তুরস্ক
তুরস্কের ইদ আনন্দ বুঝতে হলে নিকটবর্তী সমূদ্রের কাছে চলে যাওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই ৷ কারন তুরস্কে ইদ সংক্রান্ত সকল প্রস্তুতি এবং উদযাপনের কেন্দ্রে রয়েছে টার্কিশ মনোমুগ্ধকর সী-বিচগুলো ৷

ইদকে ঘিরে সমূদ্রের কাছে ঝলমলে বাতির কারসাজি দেখতে সারাদিন ধরেই দলে দলে মানুষ ভিড় করে সমূদ্র সৈকতগুলোতে৷ মাছ ধরা, সাতার কাটা, সী সার্ফিংসহ দিনভর অনেক উৎসবে মেতে থাকে তারা ৷ তুর্কিরা ইদকে বলে ‘সেকের বায়রাম’, বাংলায় যার অর্থ মিষ্টান্ন উপভোগের উৎসব ৷ ফলে শুধু মাত্র ইদকে কেন্দ্র করে সারা তুরস্ক জুড়ে সুস্বাদু নানান পদের মিষ্টান্ন তৈরি ও পরিবেশনের ধুম পড়ে যায় ৷
চীন
চীনে প্রায় ২৩ মিলিয়ন মুসলমানের বাস ৷ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো চীনেও অনেক আড়ম্বরের সাথে ইদ উদযাপন করা হয়ে থাকে ৷
ইদের দিন মৃত আত্মীয় স্বজনের কবরে উপস্থিত হয়ে, তাদের রুহের জন্য শান্তিকামনা করা চীনের ইদ সংস্কৃতির একটি বড় অংশ ৷ ত্রিশ দিন রোজা রাখার পর নতুন কাপড় পরিধান করে চীনে ইদের উৎসব আবহ শুরু হয় ৷

বয়স,লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিবেশী ও নিজেদের ভেতর ইদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে এখনো চীনে ইদের দিন বিভিন্ন সুস্বাদু খাদ্য পরিবেশনের চল জারি রয়েছে ৷
ইংল্যান্ড
ইউরোপে সবচেয়ে জাঁকজমক পূর্ণ ইদ উদযাপিত হয় ইংল্যান্ডে ৷ ব্রিটিশ মুসলমানরা ইদের নামাজের মাধ্যমে উৎসবের আবহে প্রবেশ করেন ৷

ইদের দিন পরিবারের সবাই একসাথে বসে খাওয়া ব্রিটিশদের ইদ উদযাপনের আদি রীতি ৷ ব্রিটেনে মুসলমানদের ভেতর এশিয়ানদের সংখ্যা যেহেতু তুলনামূলক বেশি তাই ব্রিটেনে ইদের খাবার আয়োজন মানেই এশীয় খাবারের প্রাচুর্যতার গল্প।
ইদের দিন বাড়ি সাজানো, নতুন কাপড় পরিধান, ছোটদের উপহার, আত্মীয় স্বজনের কবরে গিয়ে তাদের জন্য দোয়া করা, ইদ কনসার্টের ভেতর সারাটা দিন উদযাপনের মাধ্যমে খুব আনন্দঘন অবস্থায় যুক্তরাজ্যে ইদ উদযাপিত হয় ৷
লেবানন
লেবাননের ইদের সকাল শুরু হয় ‘কুনাফেহ’ নামক একপ্রকার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্নের স্বাদ গ্রহনের মাধ্যমে ৷
বাচ্চারা নতুন কাপড়ে সজ্জিত হয়ে অভিভাবদের সাথে ইদের নামাজ আদায় করতে ইদগাহে জড়ো হয় ৷ নামাজ শেষে পারস্পারিক সৌহার্দ্য বিনিময়ের পরে মুসলিমরা পূর্বপুরুষদের কবরে মোমবাতি এবং আগরবাতি প্রজ্জ্বলন করে ৷

কবর জিয়ারতের পর পর গরীব দুঃখীদের জন্য উপহার বিতরণ, ছোটবাচ্চাদের সালামী দেয়া লেবাননের ইদ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ৷ ‘কাক এল ইদ’, ‘মামৌল’ লেবাননের ঐতিহ্যবাহী খাদ্য যা কেবল ইদের দিন ঘরে ঘরে তৈরি করা হয় ৷ এ ছাড়াও ইদের দিন লাঞ্চ এবং ডিনারে পাতে ‘মৌলুখিয়ি’, ‘মুঘরাবিয়ি’, ‘রেজ আ ডেজিজ’ এর মত সুখাদ্য ছাড়া লেবানিজ ইদ কল্পনা করা এক অসম্ভব ঘটনা ৷
ইদ উপলক্ষে লেবাননে বিভিন্ন স্ট্রিট কনসার্টের আয়োজন করা হয় ৷ প্রতিবেশীদের সাথে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার এই জমজমাট দিনটিকে লেবাননের সবচেয়ে বড় আনন্দের উপলক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় ৷
এই মহামারী কালে, গেল দু’বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিজস্ব রীতিতে ইদ উদযাপনের স্বাভাবিক ঘটনা অনেকটাই বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে ৷ তবে আপনার মতো আমরাও আশা রাখি পৃথিবীতে আবার সুদিন ফিরবে ৷ সেই সুদিনের আশাবাদ জারি রেখে সবাইকে ইদের শুভেচ্ছা জানাই ৷
References:
Feature Image: Bproperty.com
