নিঝুম রাত তবে নিস্তব্ধ নয়। পাকিস্তানী বাহিনীর ক্যাম্পে ভুঁড়ি ভোজ চলছে, গ্রামেরই কোন গরীব কৃষকের খাসী ধরে এনে হয়তো জবাই করা হয়েছিল ঐ দিনে। হৈ-হুল্লোড় করে খাওয়ায় ব্যস্ত পাকসেনাদের কোন ধারণাই নেই কিছু দূরেই ঘাপটি মেরে বসে আছে এক গেরিলা দল, নেতৃত্বে আজম খান। সামান্য ইশারায় যারা ঝাঁপিয়ে পড়বে বন্দুকে গর্জন তুলে। বন্দুকের ট্রিগার চাপার আগে কেন যেন আজম খান গুণগুণ করে গেয়ে উঠলেন । গর্জে উঠলো স্টেনগান, উল্লাস ভোজন আপ্যায়নে ব্যস্ত পাক বাহিনী বুঝে ওঠার আগেই ছয়জন খতম। কিছু পরে গেরিলা বাহিনীও পগারপার।
গেরিলা যুদ্ধের নিয়মে সেদিন এভাবে পালালেও আজম কখনো যুদ্ধের ভয়ে ময়দান ছেড়ে পালাননি, জীবনযুদ্ধেও ক্যান্সারের সাথে লড়ে গেছেন শেষদিন পর্যন্ত। ৩০ টি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেওয়া আজম খান কেন যেন যুদ্ধের প্রশ্ন এলেই চুপ করে যেতেন, চোখ ভরা থাকত অভিমান।

হয়তো যে স্বপ্ন কিশোর আজম দেখেছিল ১৯৬৬ এর ছয় দফায়, যে স্বপ্নের তাড়নায় গণসংগীত শিল্পীগোষ্ঠি ‘ক্রান্তি’ র হয়ে চিৎকার করে বিদ্রোহী দেশের গান করে গেছেন ‘৬৮ থেকে, যে স্বপ্ন সত্যি করতে ২৫ মার্চের পরই ঢাকা থেকে কুমিল্লা আর তারপর হেঁটে চলে গিয়েছিলেন বর্ডার পার হয়ে আগরতলা, সেখান থেকে মেঘালয়ে, খালেদ মোশাররফের শিষ্য হয়ে যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে, সে স্বপ্ন স্বাধীনতার পর মেলেনি বলেই কি এতো অভিমান?

মায়ের কাছে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চাইতেই তিনি পাঠালেন বাবার কাছে। সরকারী চাকুরীজীবি বাবা বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা কথাই বলেছিলেন, ‘যুদ্ধে যাচ্ছিস যা, দেশ স্বাধীন না করে ফিরবি না।’
এমন সাহসী দেশপ্রেমিক বাবার সন্তানের গলা থেকেই যে ‘বাংলাদেশ’ গানটা বেরুবে গিটারের ছয় তারে উন্মাদনার সুর তুলে, সে তো জানা কথাই। ক্র্যাকপ্লাটুনের কথা বলতে গিয়ে জাহানারা ইমাম একাত্তরের দিনগুলি’ তে লিখেছিলেন, ‘২০ আগস্ট ১৯৭১। একটি তাঁবুতে আলো জ্বলছে। সেখান থেকে ভেসে আসছে গানের সুর—“হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ।” বুঝলাম আজম খান গাইছে। আজম খানের সুন্দর গলা। আবার অন্যদিকে ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা।’
ক্র্যাকপ্লাটুনেরই সদস্য, আজম খানের বন্ধু, সহযোদ্ধা, লেখক ও নাট্যকার নাসিরউদ্দিন ইউসুফ স্মৃতিচারণ করেন, ‘‘আজম খান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে সাংস্কৃতিক জগতে একজন বিস্ময়কর ব্যক্তি। এই আজম খানের বেড়ে ওঠার সময়ের একজন সাক্ষী আমি। ষাটের দশকে কৈশোর ও যৌবনের আবেগদীপ্ত সময় একসঙ্গে কাটিয়েছি আমরা কজন ঢাকার বন্ধু। আজমের সারল্য আমাকে কৈশোরেই আকৃষ্ট করেছিল। আমাদের ছাত্রজীবন কেটেছে আন্দোলনে-সংগ্রামে। একটি জাতির স্বাধীন হওয়ার প্রক্রিয়ায় আমরা সবাই জড়িয়ে পড়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আজম মেলাঘরের পাহাড়ের পাদদেশে টিনের বাসন ও চামচ দিয়ে তাল ঠুকে গান গাইতেন, সঙ্গে ছিল অনেক তরুণ যোদ্ধা। এ দৃশ্য ভোলা যায় না!’
আজম খানের বাদ্যযন্ত্র বাজানো ঐ থালাবাটি পর্যন্তই, কোন বাদ্যযন্ত্রই বাজাতে জানতেন না। অথচ কেউ কোন কিছু ভুল বাজালে সাথে সাথে ধরে ফেলতেন, এমনই শক্তিশালী কান আর অদ্ভুত মিউজিক সেন্স ছিল তার।
বিখ্যাত পারকাশন বাদক কাজী হাবলু কিছুদিন আগেই এক ইন্টারভিউতে সে কথাই বললেন, তখনকার বাজে সাউন্ডের স্টেজেও তিনি ভুল বাজানোর সাথে সাথে আজম খান ঘুরে তাকাতেন, আর ভয়ে তাদের আত্মারাম খাঁচা।
আরও পড়ুনঃ বাংলা ব্যান্ডের পাঁচ পীরের গল্প
অথচ ভীষণ হাসিখুশী, আড্ডাপ্রিয় মানুষ ছিলেন। বেশীর ভাগ গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন আড্ডা দিতে বসেই, চেয়ার টেবিলে তাল ঠুকে। স্বাধীনতার পর করা তার ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ এর গানের কম্পোজিশনে সাহায্য করতেন সবাইকে কিছু বাজাতে না জেনেও, মুখ দিয়ে শব্দ করেই বলে দিতে পারতেন কী চাইছেন গিটারে, ড্রামস আর কিবোর্ডে।
গুরু নামে ডাকেন তাকে ফেলো মিউজিশিয়ানরা, সে শুধু রক মিউজিক দেশে শুরু করেছেন বলেই নয়। নতুন ব্যান্ডগুলোকে স্নেহ দিয়ে একরকম পেলেপুষে আগলে রেখেছেন তিনি। মাকসুদুল হক কখনো বাংলা গানই হয়তো করতেন না যদি আজম খানের হাতে থাপ্পড় না খেতেন, হতো না আজকের ফিডব্যাক ব্যান্ড। আজম খানকে নিয়ে খুব কমই লেখা হয়েছে, যেগুলি লেখা হয়েছে তার ভেতর একটি হলো ‘বাংলাদেশের রকযাত্রাঃ আজম খানের উত্তরাধিকার’, সেখানেই লিখেছেন মাকসুদ কী ভীষণ এক যুদ্ধ আজম করেছেন ব্যান্ড সঙ্গীত নিয়ে নিজ হাতে স্বাধীন করা দেশের মাটিতেও।
স্বাধীনতার পর যখন যুবসমাজ ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে তখনই তিনি শুরু করেন আরেক আন্দোলন, শেখ কামালের পৃষ্ঠপোষকতার ব্যান্ড ‘স্পন্দন’ আর মুক্তিযোদ্ধা আজম খানের ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ প্রায় একই সাথে যাত্রা করে স্বাধীনতার পরপরই। তরুণদের মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন রক মিউজিকের এক দারুণ উন্মাদনা।

আবার সেই দেশেই যখন দুর্ভিক্ষ ১৯৭৪ সালে, সেই মর্মান্তিক দৃশ্য আজমের কোমল হৃদয় সহ্য করতে পারেনি, নিজের অল্প সামর্থ্যেই পথের মানুষগুলোকে সাহায্য করতেন, এমন সাক্ষী সমসাময়িক অনেকেই৷
কমলাপুর স্টেশনে বসে এক কান্নারত মা আর তার শিশু বাচ্চাকে দেখেই লিখেছিলেন কালজয়ী গান, ‘রেললাইনের ঐ বস্তিতে…’। ব্যান্ড মেম্বার ফিরোজ সাঁই, ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদরা সাথেই তখন, লিরিকস শুনে তাদের গা শিউরে উঠেছিলো তখনো, চোখও কি আদ্র হয়েছিল কিনা তা কেউ বলেননি, যেমন কেউ কাউকে বলেননি ঠিক পরদিন সেই মা আর তার বাচ্চার কাছে গুড়ো দুধের টিন আর কম্বল কী করে এসেছিল, বলতেও হয়নি, সবাই জানতোই কার কাজ।
আধুনিক কালে এসেও তার অবদানের শেষ নেই। নব্বই দশকে এসে যখন সবাই দেশ কাঁপানো ব্যান্ড এলআরবি, ফিলিংস, আর্ক, মাইলস, সোলস, ফিডব্যাকদের নিয়েই মিক্সড এ্যালবাম করার বানিজ্যিক চিন্তায় ব্যস্ত, তখন তিনি আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডগুলোকে নিয়ে মিক্সড এ্যালবাম করেছেন।

তেমনই এক ব্যান্ডে সুযোগ পাওয়া ব্যান্ড ব্ল্যাকের তখনকার ভোকালিস্ট জন কবিরের বলা একটা গল্প দিয়েই শেষ করা যাক। জন কবির তখনো ব্ল্যাকের জন হয়ে ওঠেননি, ব্ল্যাক ব্যান্ডও হয়নি। জন কবির নিছকই তখন মিউজিক পছন্দ করেন এমন এক কিশোর। এক দুপুরে সাহস করেই চলে গিয়েছিলেন আজম খানের বাসায়, সঙ্গে বন্ধু আরাফাত কাজী (পরবর্তীতে এটেমটেড ব্যান্ড ও ওয়াটসন ব্রাদারসের ড্রামার, বাংলাদেশে এফএম রেডিও’র প্রথম প্রোগ্রামের প্রডিউসার)। আজম খান তার চিরাচরিত স্বভাবেই বাসায় বসালেন, গল্প করলেন, গল্প শুনলেন দুই কিশোরের। জন আর আরাফাতও জানালেন আজম খানের গানে তাদের মুগ্ধতার কথা। প্রথমে কিছুটা আড়ষ্ট থাকলেও লুঙ্গী পরিহিত আজম খান যখন আড্ডা দিতে বসে গেছেন, কথা বলছেন প্রায় বন্ধুর মতো, তখন দুজনেরও ভয় কেটে গেছে। আরাফাত জানিয়েছিলেন তার আক্ষেপের কথা, তার সবচেয়ে পছন্দের এ্যালবাম ‘রকস্টার’, গানগুলো সব মুখস্ত অথচ এ্যালবামটা হারিয়ে গেছে। এখন আর কোথাও পাওয়াও যাচ্ছে না এ্যালবামটা। আজম খানের কাছেও ছিল না তার নিজের এ্যালবামই।
তবে সেদিন বিকেলে চায়ের দোকান থেকে লোক দিয়ে ডেকে নিয়ে এ্যালবামটা উপহার দিয়েছিলেন দুজনকে। আজম খান নিজে বিটিভিতে ফোন করে তাদের আর্কাইভ থেকে কপি করে এ্যালবামটা আনিয়েছেন ওইটুকু সময়ের মধ্যেই, স্রেফ এলাকার দুটো ছেলে কথাচ্ছলে জানিয়েছিল বলে।

এমনই মানুষ আজম খান, স্নেহ আর ভালোবাসায় যিনি সব সময় আকাশের মতো বিশাল। আইয়ুব বাচ্চু, হামিন আহমেদ, ম্যাক হকের মতো লিজেন্ডরাও যাকে গুরু মেনে নিয়েছিলেন তার স্নেহধন্য হয়ে, ভালোবাসা পেয়ে।
তখনকার মিডিয়া সম্ভবত নিজেদের অজ্ঞতার জন্যই তাকে পপ গুরু নামে অভিহিত করতে শুরু করে, যা তার রক মিউজিকে অবদানকে একরকম ক্ষুণ্ণই করে। তিনি অবশ্য এসব নিয়ে অভিযোগ করেননি কখনো। কিন্তু যারা জানার, তারা ঠিকই জানে, আজম খান বাংলাদেশের প্রথম রকস্টার, আজ অবধি সবচেয়ে বড় রকস্টার।
This Bangla Article is about Azam khan, the first rockstar in Bangladesh and the biggest rockstar to date in Bangladesh.
References:
Feature Image: tbsnews
