সুস্বাদু একটা বার্গারে বড় করে কামড় দেবার পর যদি জানতে পারেন এর প্যাটিটা ঘাসফড়িং দিয়ে বানানো, তাহলে কি করবেন?
আমাদের এই পৃথিবীর জনসংখ্যা এখন সাতশো কোটির ওপরে। এই সাতশো কোটি মানুষের দৈনন্দিন আহারে আমিষের যোগান দেবার মত যথেষ্ট প্রাণীজ সম্পদ পৃথিবীতে বর্তমানে থাকলেও তা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে৷ প্রাণীজ আমিষের যোগান ঠিক রাখার জন্য এখন বিকল্প উপায় খোঁজাটা সময়ের দাবী। কিন্তু আমাদের প্রকৃতিতে থাকা প্রাণীজ আমিষের একটা বড় উৎসকে কি আমরা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাচ্ছি না?
যাদের অ্যালার্জি নেই তাদের অধিকাংশই চিংড়ি খেতে ভালোবাসে। একই কথা কাঁকড়া বা ক্রেফিশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এসবই আর্থ্রোপোডা পর্বের প্রাণী। কিন্তু আর্থ্রোপোডা পর্বের অন্যান্য প্রাণীগুলোকেও কি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব, যেগুলোকে আমরা পোকা বলি, আর দেখামাত্র নাক সিটকাই?

শুনতে অবাক লাগলেও সত্য, মানবজাতির জন্মলগ্ন থেকেই মানুষ বিভিন্ন কীটপতঙ্গকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে আসছে। এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় ২০০০ এর অধিক প্রজাতির কীটপতঙ্গ মানুষের খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এই তালিকায় আছে কোকোনাট ওয়ার্ম আর বোলতার লার্ভা থেকে শুরু করে ট্যারানটুলা মাকড়সা আর বিষাক্ত কাকড়া বিছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেই অনেক গ্রামে শুকনো মরশুমে উইপোকা সংগ্রহ করা হয়। এই উইপোকা তেলে ভেজে সাধারণ খাদ্যের সাথে খাওয়া হয়। একটা উইয়ের ঢিবিতে যত উইপোকা পাওয়া যায় তা দিয়ে গোটা গ্রামের যথেষ্ট খাবার হয়ে যায়।

জাপানে বিলাসী খাবার হিসেবে খাওয়া হয় ঘাসফড়িং ভাজা আর বোলতার লার্ভা।
মেক্সিকো আর দক্ষিণ আমেরিকাতে, ঘাসফড়িঙের পাশাপাশি, পিঁপড়া, ট্যারানটুলা মাকড়সা আর বিষাক্ত কাঁকড়াবিছেও খাওয়া হয়।
এশিয়ার দেশগুলোতে, কোকোনাট ওয়ার্ম, বিভিন্ন পোকামাকড়ের লার্ভা, ডিম, ঘাসফড়িং, শতপদী, বিছে, মাকড়সা, তেলাপোকাসহ নানা ধরণের পতঙ্গ খাওয়া হয়। স্ট্রিটফুড হিসেবে তো বটেই এমনকি নামকরা রেস্তোরাঁগুলোতেও খাবার হিসেবে পরিবেশন করা হয় বিভিন্ন কীটপতঙ্গের নানা মুখরোচক রেসিপি।

চিংড়ি, কাঁকড়া এসব তো আমাদের দেশেই খাওয়া হয়।
কম বেশি কীটপতঙ্গ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার চল সারা বিশ্বেই আছে। কাঁচা বা রান্না করে যেকোন ভাবেই খাওয়া যায় এদেরকে।
শুনে গা গুলিয়ে উঠছে?
ওসব দেশে কিন্তু এগুলো খুবই মুখরোচক আর পুষ্টিকর খাবার বলে স্বীকৃত। পোকা খেতে চিংড়ি বা সাধারণ মাংসের মতই লাগে। ঘাসফড়িং খেতে লাগে বাদামের মত। কোকোনাট ওয়ার্মে রয়েছে নারকেলের স্বাদ।

কিন্তু এগুলো খাওয়াটা কতখানি স্বাস্থ্যসম্মত?
পোকামাকড়ের হজমশক্তি ও আমিষ পাচনের ক্ষমতা অন্য যেকোন প্রাণী থেকে প্রায় বারোগুণ বেশি। ফলে তাদের শরীরে আমিষ উৎপাদনের ক্ষমতাও প্রায় বারো থেকে ২৫ গুণ বেশি। ১০০ গ্রাম গরুর মাংস আর একশো গ্রাম ঘাসফড়িঙে আমিষের পরিমাণ প্রায় সমান। এছাড়াও এদের দেহে থাকা আবরণী তৈরি হয় কাইটিনে যা একধরণের প্রাণীজ আমিষ। এখান থেকে যে পুষ্টিমান মানুষ গ্রহণ করে তাতে ক্ষতিকারক উপাদান প্রায় থাকে না বললেই চলে। বিশেষ করে চর্বি বা কোলেস্টেরল। তার থেকেও বড় কথা এটা অত্যন্ত সাশ্রয়ীও। যেমন এক কেজি ঝিঝিপোকা খাবারের উপযোগী হিসেবে তৈরি করতে দরকার হয় মাত্র এক লিটার পানি, অপরপক্ষে এক কেজি গরুর মাংস তৈরি হতে খরচ করতে হয় প্রায় ২২০০ লিটার পানি। কিন্তু আমিষের পরিমাণ দুটোতেই সমান।
আরও পড়ুনঃ কফি লুয়াক – পৃথিবীর সবচেয়ে দামী কফির গল্প
গবাদিপশু প্রচুর পরিমাণে মিথেন আর অ্যামোনিয়া গ্যাস বর্জ্য পদার্থ হিসেবে ত্যাগ করে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে মিথেন কার্বনের থেকেও বেশি ভয়ংকর। আর কীটপতঙ্গের বর্জ্য কতটা হতে পারে তা তো আন্দাজ করাই যায়। তার থেকেও বড় সুবিধার কথা হচ্ছে, কীটপতঙ্গ খাবার হিসেবে সেসবই গ্রহণ করে যেগুলো মানুষ এমনিতেও আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেয়। ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবার্গের এক গবেষনায় জানা গেছে যে পতঙ্গকে খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে, ও এর চাষাবাদ ব্যাপক হারে শুরু হলে, পশুজ মাংসের ওপর নির্ভরতা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে আর সেক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে ১৬৮০ মিলিয়ন হেক্টর জমি খালি করা সম্ভব হবে। অব্যবহার্য্য বর্জ্যপদার্থ পতঙ্গের খাবার হওয়ায় পৃথিবী থেকে বর্জ্যের পরিমাণও কমবে।
এই লেখাটা পড়ে যদি আপনি পোকা খেতে শুরু করেন তাহলে কিন্তু হবে না৷ অনেক কীটপতঙ্গ আছে যেগুলো ভয়ংকর বিষাক্ত, অনেকের আছে অ্যালার্জিক রিয়্যাকশন। এসব খাওয়ার পর অসুস্থ হওয়া বা মৃত্যু হওয়াও অস্বাভাবিক না। শুধু যেগুলোর মধ্যে ক্ষতিকর কোন উপাদান নেই সেসব পতঙ্গই খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

কেন, আমাদের প্রাণীজ আমিষের ওপর নির্ভরতা কমানো উচিত? কারণ পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, কিন্তু সেই হারে বাড়ছে না জায়গা ও গবাদিপশুর সংখ্যা। পাশাপাশি পশুপালনের খরচও অত্যন্ত বেশি। পশুপালনের জন্য জায়গাও লাগে প্রচুর। পশুর মাংসে থাকে প্রচুর চর্বি যা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায়। কীটপতঙ্গে সেই ঝামেলাটা নেই। এই জন্যই পতঙ্গ পেয়েছে সুপারফুডের তকমা। সমগ্র ইউরোপে ২০২৭ সালের মধ্যে পতঙ্গ নির্ভর খাদ্য বাজারে চলে আসবে। ইউরোপিয়ান কনস্যুমার অর্গানাইজেশন খাদ্য হিসেবে পতঙ্গকে স্বীকৃতি দিলেও, ইউরোপের মাত্র ১০% মানুষ পতঙ্গকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি আছে। একই চিত্র আরও অনেক জায়গাতেও।

কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, পৃথিবীর সবাই আমরা কম বেশি খাদ্যদ্রব্যের সাথে পোকামাকড়ও খাই। যেহেতু কারখানায় খাদ্য উৎপাদন একটা বিশাল কর্মযজ্ঞ সেহেতু পরিপূর্ণ ভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। বিভিন্ন পোকামাকড় প্রায়ই মেশিনের ভেতর ঢুকে খাবারের সাথে মিশে যায়। যেমন, চকলেট, কফি, ফলের রস, সিরিয়াল এসমস্ত খাবারের সাথেই কিছু না কিছু পোকামাকড়ের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে যায়। খাদ্যের মাননিয়ন্ত্রণ সংস্থা সমূহ তাই এর একটা পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছে। যেমন চকলেটের ক্ষেত্রে একশো গ্রাম চকলেটে ৬০ টি পর্যন্ত পতঙ্গের ক্ষুদ্র অংশ গ্রহণযোগ্য।
আমাদের চেনা পৃথিবী খুব দ্রুত বদলাচ্ছে, হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, জীববৈচিত্র ও বনজ সম্পদ এখন হুমকির মুখে। পৃথিবীকে রক্ষা করতে হলে এখন খাদ্য ও অন্যান্য সম্পদের বিকল্প ব্যবস্থা করা। ভবিষ্যতের পৃথিবী পতঙ্গকে খাদ্য হিসেবে কতটা গ্রহণ করে এখন সেটাই প্রশ্ন।
Reference:
- https://www.bbc.com/future/article/20210420-the-protein-rich-superfood-most-europeans-wont-eat
- https://agricultureandfoodsecurity.biomedcentral.com/articles/10.1186/s40066-015-0041-5
- https://migrationology.com/how-to-eat-scary-insects-worms-and-bugs-in-thailand/
- https://fb.watch/5IWPCXSBM3/
Feature Image: BBC
