স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীত তেমন সক্রিয় না থাকলেও স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাস নতুন নানা বাঁক বদলের মাধ্যমে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে ৷ এখন বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীত নিয়ে যে হৈ হৈ রৈ রৈ রব শোনা যায়, ব্যান্ড সংগীতকে যত সহজে এই দেশে গ্রহন করার চল শুরু হয়েছে, তা আজ থেকে মাত্র পঞ্চাশ বছর আগেও ‘অপসংস্কৃতি’ নামেই সর্বত্র পরিচিত ছিল ।
স্বাধীনতা পরবর্তী পপ সংগীতের বর্নাঢ্য পথচলা তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে ব্যান্ড সংগীতকে মাথা তুলে দাঁড়াবার শক্তি দিয়েছিলো ৷ সেই শক্তির বলেই হয়তো বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীত আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে ৷ আজকে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীত যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, তার গোঁড়া খুঁজতে গেলে যে ৫ জন প্রথিতযশা পপ সংগীত শিল্পীর নাম সামনে উঠে আসে, তাদেরকে একসঙ্গে ‘বাংলা ব্যান্ডের পাঁচ পীর’ নামে ডাকা হয় ৷ চলুন আজকে বাংলা ব্যান্ড ইতিহাসের সেই পাঁচ পীর সমন্ধে একটু জেনে আসি ।
আজম খান
পাঁচপীরের প্রথম ও প্রধান পীর আজম খান ৷ আজম খানের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান হলেও তিনি আজম খান নামেই সুপরিচিত ছিলেন ৷ বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীত আন্দোলন এবং পপ সংগীতের বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় তাকে ‘গুরু’ নামেও ডাকা হয় ৷ পশ্চিমা ধাঁচের পপগানে দেশজ বিষয়ের সংযোজন ও তার গান পরিবেশনার স্বতন্ত্র রীতি পরবর্তীতে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল ৷

উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানে গণসংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সংগীত জগতে পা রেখেছিলেন আজম খান ৷ গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহন করেছিলেন বাংলা গানের এই কিংবদন্তী পুরুষ ৷ মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবিরে গান গেয়ে সহযোদ্ধাদের চাঙ্গা করবার পাশাপাশি বেশ কয়েকবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সামনে থেকে লড়াই করার গৌরব ছিলো আজম খানের।
স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সালে আজম খান তার বন্ধুদের নিয়ে ‘উচ্চারণ’ নামে একটি ব্যান্ড গঠন করেন ৷ ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ ১৯৭২ সালেই বিটিভিতে এক কনসার্টে ‘এত সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ ও ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দু’টি পরিবেশন করে ব্যাপক সাড়া তৈরি করে ফেলেছিলো ৷ সেই ধারাবাহিকতাতেই পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন করে ব্যান্ড সংগীতের ধারনা মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সাহস তৈরি করতে পেরেছিল বলে ধারনা করা হয় ।
১৯৭৪-১৯৭৫ সালের দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে আজম খানের একের পর এক নতুন গান প্রচারিত হওয়ার ঘটনা তৎকালীন তরুণ শিল্পীদের বিকল্প ধারার গান সৃষ্টিতে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলো ৷ আজম খানের পাড়ার বন্ধু ছিলেন ফিরোজ সাঁই। পরবর্তীকালে ফিরোজের মাধ্যমে আজম খান ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজের সাথে পরিচিত হন। এবং তাদের কেমেস্ট্রিই পরবর্তীতে বাংলা পপ সংগীতকে বিশ্বের বুকে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরিতে সাহায্য করে৷
‘এক যুগ’ নামে তার প্রথম অডিও অ্যালবামটি ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয় । ১৭টি একক, পাশাপাশি ডুয়েট ও মিশ্র অ্যালবাম মিলিয়ে তাঁর মোট অ্যালবাম সংখ্যা ২৫টির মতো । এই ২৫টি অ্যালবামের অধিকাংশ গান আজও মানুষের মুখে ফেরে ৷

পপসম্রাট খ্যাত আজম খান দীর্ঘদিন দুরারোগ্য ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে ২০১১ সালের ৫ ই জুন ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৷ সঙ্গীতে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করেছে ৷
ফেরদৌস ওয়াহিদ
ফেরদৌস ওয়াহিদের জন্ম ১৯৫৩ সালের ২৬ শে মার্চ, বিক্রমপুর জেলায় ৷ জীবনের প্রাথমিক সময়ে কানাডা চলে গিয়েছিলেন চিরতরুণ এই পপ সংগীত মায়েস্ত্রো ৷ বিদেশে অবস্থানকালীন সময়ে পাশ্চাত্য সংগীতের প্রতি তার তীব্র আগ্রহ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সংগীতে যুগান্তকারী প্রভাব সৃষ্টি করেছে ৷
ফেরদৌস ওয়াহিদ তার গান জীবনের শুরুর দিকে রবীন্দ্র সংগীত, লোকসংগীতে তালিম নিয়েছিলেন ৷ তার গুরু ভাগ্য ছিলো অসাধারণ। কেননা আবদুল আলিম, মনমোহন দত্ত, ওস্তাদ ফজলুল হকের মানুষদেরকে তিনি গুরু হিসেবে পেয়েছিলেন ৷ তারপরই পাশ্চাত্যের এলভিস প্রিসলি দ্বারা দারুণ অনুপ্রাণিত হয়ে ফেরদৌস ওয়াহিদ বাংলা পপে নিজস্ব স্টাইলের গানবাজনায় মনোনিবেশ করেন ৷ সত্তরের দশকে নিজস্ব ব্যান্ড ‘স্পন্দন’ গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলা সংগীতে নতুন স্বাদ আবিষ্কার ফেরদৌস ওয়াহিদকে তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিলো৷

ফেরদৌস ওয়াহিদের দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের সংগীত জীবনে তিনি বাংলাদেশের বহু গুণী সংগীত শিল্পী ও পরিচালকের সাথে ক্লান্তিবিহীন কাজ করেছেন ৷ টেলিভিশন, বেতার, অ্যালবামের পাশাপাশি সিনেমাতেও প্লে ব্যাক করেছেন মেধাবী এই সংগীত শিল্পী ৷ তার গাওয়া ‘মামুনিয়া’, ‘এমন একটা মা দেনা’, ‘আগে যদি জানতাম’ সহ আরো অনেক গান স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের পপ সংগীতের কালজয়ী ইতিহাসের স্মারক ।
আরও পড়ুনঃ শতবর্ষ পেরিয়ে সত্যজিৎ – সিনেমার পেছনের ছবি
ফকির আলমগীর
ফকির আলমগীর ১৯৫০ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী ফরিদপুরের ভাঙায় জন্মগ্রহন করেন ৷ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করা এই শিল্পী বাংলাদেশের গণসংগীত আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ৷
কলেজ জীবন থেকেই বাম ঘরানার রাজনীতি করার কারনে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে ফকির আলমগীরের সক্রিয় অংশগ্রহন ছিলো ৷ সেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক নানা অসংগতিতে গণ মানুষকে সচেতন করার গান, গণসংগীতেই ফকির আলমগীর তার সারাটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন ৷ তবে শুধু গণসংগীতেই নয়, পরবর্তীতে বিভিন্ন পপ সংগীত আয়োজনেও ফকির আলমগীরের অদ্ভুত কন্ঠস্বর এদেশের গানপাগল মানুষের মনে ব্যতিক্রমী ভালো লাগার অনুভব তৈরি করেছে ৷ আর সে কারনেই আজও তুমুল জনপ্রিয় এই মেধাবী গণসংগীত শিল্পী ৷

ফকির আলমগীরের গানে সবসময় সাধারন মানুষের কথাই উঠে এসেছে ৷ আবহমান বাঙালি লোকসংগীত এবং পপ সংগীতের ফিউশনে তিনি ‘ও সখিনা গেছস কিনা’, ‘সানতাহার’, ‘মন আমার দেহঘড়ি’, ‘মায়ের একধার দুধের দাম’ সহ অনেক গানকে নতুনভাবে মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ৷ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কন্ঠযোদ্ধা মহান এই সংগীত শিল্পী নিজের বর্ণাঢ্য সংগীত জীবনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন ৷
ফিরোজ সাঁই
বাউল গান ছাড়াও বাংলাদেশে দেহতত্ত্ব, মুর্শিদী, ভাটিয়ালীসহ নানা ধরনের আধ্যাত্মিক লোক সংগীতের প্রচলিত৷ এখন পর্যন্ত এই আধ্যাত্মিক লোকসংগীতগুলো বাংলার আপামর জনসাধারনের কাছে নিজস্ব তুমুল জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে ৷ সত্তরের দশকে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে পপ সংগীতের যখন একেবারে রমরমা অবস্থা, তখনকার সময়ে যে কয়জন তরুণ শিল্পীর হাত ধরে বাংলা লোকসংগীতের আধ্যাত্মিক সুর বাংলা পপসংগীতে ঢুকে পড়েছিলো, ফিরোজ সাঁই তাদের মধ্যে অন্যতম ৷

ফিরোজ সাঁইয়ের গাওয়া গানগুলোর ভেতর — ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা’, ‘ইস্কুল খুইলাছে রে মওলা’, ‘ইঞ্জিন যদি চইলা যায়’ সহ প্রভৃতি গানগুলো আজও মানুষ ভাল ভাবেই মনে রেখেছে ! ১৯৯৫ সালের ১২ জানুয়ারি, শিল্পকলা একাডেমিতে হাজার হাজার দর্শক শ্রোতার সামনে মঞ্চে গান পরিবেশরত অবস্থায় ফিরোজ সাঁই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন ৷ আশ্চর্যের বিষয় হলো ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা’ গানটি গাইতে গাইতেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন ৷ সংগীতে অবদান রাখার জন্য ফিরোজ সাঁই ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সরকারের মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন ৷
পিলু মমতাজ
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের পপ সংগীতে পিলু মমতাজ ছিলেন অনন্য এক কন্ঠস্বর ৷ যুদ্ধ বিধ্বস্ত নতুন একটি দেশে পিলু মমতাজের মতো নারী শিল্পীর আবির্ভাব নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ৷
পিলু মমতাজের জন্ম ঢাকায় ৷ বাংলা লোকসংগীতের কিংবদন্তী শিল্পী ওস্তাদ মমতাজ আলী খানের তৃতীয় কন্যা ছিলেন পিলু মমতাজ ৷ সত্তরের দশকে পপ সংগীতকে দেশের আপামর সাধারন শ্রোতাদের কাছাকাছি নিয়ে আসার জন্য আজম খান,ফেরদৌস ওয়াহিদ, ফকির আলমগীর, ফিরোজ সাঁইদের মতো পিলু মমতাজকেও গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয় ৷
পপ সংগীতে পারফর্মেন্সকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় ৷ বাংলাদেশের পপ মিউজিক প্রেক্ষাপটে পারফর্মেন্স বিষয়টি নতুন এক মাত্রা পেয়েছিলো পিলু মমতাজের হাত ধরেই ৷ এ কারনেই শ্রোতাদের কাছে পিলু মমতাজ খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন ৷ তবে শুধু যে স্টেজ শো, পপ গানেই পিলু মমতাজ নিজেকে আটকে রেখেছিলেন — এমন নয় ৷ স্টেজ শো’র পাশাপাশি বেতার এবং টেলিভিশনে পপ গানের সাথে সাথে আধুনিক বাংলা গান পরিবেশন করে পিলু মমতাজ শ্রোতাদের মনে স্থায়ী এক আসন তৈরি করে নিয়েছিলেন ৷

পিলু মমতাজের গাওয়া ‘মাঝি নাও ছাইড়া দে’, ‘ওরে সাম্পানওয়ালা’, ‘নানীগো নানী আমারে নি লইয়া যাইবা ভাইসাবের বাড়ি’, ‘চারা গাছে ফুল ফুইটাছে’, ‘একদিন তো চলে যাবো’ — গানগুলো এখনো মানুষের মুখে মুখে ফিরে ৷ কিন্তু তুমুল জনপ্রিয়তা থাকা স্বত্ত্বেও নব্বই দশকের গোড়ার দিকে কিংবদন্তী এই নারী শিল্পী কোন এক অজানা কারনে সংগীত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন ৷ এবং মৃত্যুর আগ অবধি নিজের এই আশ্চর্য গুটিয়ে রাখা তিনি জারি রেখেছিলেন ৷
আজকে আমাদের ব্যান্ড সংগীতে নারীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহনের যাত্রা পিলু মমতাজকে ঘিরেই শুরু হয়েছিলো ৷ পাঁচপীরের এই সর্বশেষ সদস্য ২০১১ সালের ২৩ শে মে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন ৷
উপরের পাঁচজনের প্রভাবে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতকে আরো পরিণত করেছে ৷ ধীরে ধীরে রক, ব্লুজ, সাইকাডেলিক ঘরানায় এ দেশীয় ব্যান্ডগুলো সেই যে নিজেদের মেলে ধরতে শুরু করেছিল সে যাত্রা আজও এক দূর্বার গতিতে চলমান ৷ বাংলা ব্যান্ড ভবিষ্যতে যত দূরেই যাক— এই পাঁচ পীর সর্বদাই তাদের কাজের মাধ্যমে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন ৷
This Bangla article is about five famous pop music artists of Bangladesh, they were collectively called ‘The Pir of Bangla Band’.
References:
- বাংলাদেশে ব্যান্ড সঙ্গীত আন্দোলন । লেখক: লতিফুল ইসলাম শিবলী (শব্দশৈলী প্রকাশনী)
- উইকিপিডিয়া
Feature Image: Prothomalo
