স্বাধীনতার ঠিক পরেই, ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট অডিটোরিয়ামে শো, আজম খান উঠলেন স্টেজে উচ্চারণ ব্যান্ডের সাথে। সদ্য যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধা আজম খান সেদিন স্টেজে উঠেছিলেন স্টেনগান হাতেই। পরবর্তীতে অস্ত্র জমা দিলেও কন্ঠে ধারণ করা স্টেনগান সারাজীবন আছড়ে পড়তো মাইক্রোফোনে, কনসার্ট থেকে কনসার্টে। নতুন ধারার এই ব্যান্ড সঙ্গীত ছড়িয়ে দেয়ার যে যুদ্ধ আজম খান শুরু করেছিলেন, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম চলছে আজ অবধি।
ব্যান্ড সঙ্গীতকে এখনো যুদ্ধই বলতে হচ্ছে কারণ অনেক লিজেন্ডারি ব্যান্ডের জন্ম এবং জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তার পরও এ দেশে এখনো ব্যান্ডকে পেশা হিসেবে গ্রহণ প্রায় অসম্ভব পর্যায়েই। মেইনস্ট্রিম ব্যান্ডই যেখানে নিজেদের জন্য কোন ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে পারেনি, সেখানে আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড বাংলাদেশে গড়ে ওঠার কোন প্রশ্নই ছিল না। কিন্তু সেখানেই মানুষটার ম্যাজিক, গডফাদারের কারিশমা।
বেসবাবা নাকি গডফাদার?
সাইদুস সুমন – বহু পরিচয়ে পরিচিত মানুষটার সবচেয়ে বড় পরিচয় অর্থহীন ব্যান্ডের লিডার, ভোকালিস্ট এবং বেজিস্ট হিসেবে। অর্থহীনের বেশীরভাগ গানের কম্পোজিশন এবং লিরিকও তার নিজের করা।
অর্থহীনের বাইরেও এক সময় বাজিয়েছেন দেশের অন্যতম সেরা ব্যান্ড ওয়ারফেজে, বেজিস্ট ছিলেন লিজেন্ডারি রকস্টার জেমসের ব্যান্ড ফিলিংসের শুরুর দিকেও।

উনত্রিশটি কোম্পানির সিইও হিসেবে কাজ করা সুমন ব্যবসায়ী হিসেবেও সুপ্রতিষ্ঠিত।
ভৌতিস্ট নামে একটা টিমের লিডারও তিনি। সাকিব, জিবরানদের নিয়ে দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রচলিত ব্যাখ্যাতীত স্থান ও ঘটনা নিয়ে রেডিও ও টিভি শো করেও জনপ্রিয়তার শিখরে ছিলেন এক সময়।
ইদানিংকালে তিনি বেশী পরিচিত ক্যান্সার থেকে ফিরে আসার মোটিভেশান হিসেবে। পত্রিকা থেকে শুরু করে অনলাইন পোর্টালগুলোর বদৌলতে তার মনের জোর যেন ডিপ্রেশনে থাকা মানুষদের জন্য বেঁচে থাকার ইন্সপিরেশন।
এত সব কিছুর পরও যা নিয়ে কখনো প্রায় আলোচনাই হয় না, তিনি নতুন ব্যান্ড এবং মিউজিশিয়ানদের জন্য সব সময় ছিলেন অভিভাবক হয়ে। আলোচনা হয় না, কেউ বলে না, কেউ লেখে না বলেই তিনি অলিখিত গডফাদার।
যেভাবে শুরু
অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, এখনকার জনপ্রিয় ব্যান্ড শিরোনামহীনের বেজিস্ট জিয়া তখন থ্র্যাশহোল্ড নামে একটি মেটাল ব্যান্ডে বাজাতেন। পিজি হাসপাতালের মর্গের নীচে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড কনসার্ট আয়োজন করে থ্র্যাশহোল্ড, নিজেরা ওপেন করে এবং প্রথমবারের মত ক্রিপটিক ফেইট কোন কনসার্টের হেডলাইনার ব্যান্ড হিসেবে পারফর্ম করে।

সেখানেই গেস্ট হিসেবে এসেছিলেন সুমন, প্রথম বারের মত পরিচয় হয় আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড মিউজিসিয়ানদের সাথে। আগে সুমনের চলাফেরা ছিল সিনিয়র মিউজিসিয়ানদের সাথেই, কিন্তু এই কনসার্টের মুগ্ধতা এবং সদ্য কৈশোর পেরুনো তরুণ মেটাল হেডদের মিউজিকের প্রতি আকর্ষণ বেসবাবাকে অন্য ভাবে ভাবতে বাধ্য করে।

সেই থেকেই শুরু, ধানমন্ডি আবাহনী মাঠের উল্টোদিকে ‘কাশফুল’ নামের একটি বাসায় সুমন থাকতেন, সেই বাসাই হয়ে ওঠে আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড গুলোর আড্ডার তীর্থ, আর সুমন হয়ে উঠেছিলেন সেই বড়ভাই যার কাছে ভালো মিউজিক করার জন্য যে কোন সাহায্য দু’বার চাইতে হয় না।
কেমন ছিল সে বাসা?
বাসায় ঢোকার আগে বাসার বাইরের বর্ণনা দেয়া যেতে পারে। সকাল বাদে দিন রাতের প্রায় সব সময়ই দরজাটা খোলা, দরজার সামনে দশ বিশ জোড়া জুতাই বলে দিত ভেতরে বেশ জম্পেশ আড্ডা চলছে।
বাসায় ঢুকতেই লম্বা এক লাউঞ্জ, বিশাল সাইজের বেশ কয়েকটি সোফা রাখা আছে রুম জুড়ে, এক কোণে আছে টেবিল টেনিসের ব্যবস্থাও।
আরেক পাশের রুমে ছোট একটা হোম স্টুডিও, যেখানে তখনই ডিজিটাল রেকর্ডিং এর ব্যবস্থা ছিল, সব ড্রামস মাইক সেটআপ করে রেকর্ডের ব্যবস্থাও ছিল।

পাশে কম্পিউটারে কেকওয়াকের মতো মিক্সিং মাস্টারিং সফটওয়্যারও আছে। ওই সময়ে বাসায় এমন ডিজিটাল স্টুডিওর কথা চিন্তাও করা যেত না, সুমন সেই স্টুডিওকেও রেখেছিলেন সবার জন্য উন্মুক্ত।
আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডের অভ্যুত্থান
সিনিয়রদের হাত ধরে, তাদের ছাড় দেয়া জায়গার সুযোগ নিয়ে জুনিয়ররা উঠে আসবে, এটাই পৃথিবীর নিয়ম। তবে বাংলাদেশের সিনিয়র মেইনস্ট্রিম ব্যান্ডরাই যখন সংগ্রাম করছে নিজেদের টিকিয়ে রাখার, তখন আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডের জন্য সুযোগ দেয়া এবং পাওয়া বেশ কঠিনই হয়ে পড়ে। সে জায়গায়ই অভূতপূর্ব এক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন বেসবাবা সুমন। জি সিরিজ অডিও লেবেলের কর্ণধার খালেদের সাথে একত্রিত হয়ে ক্রমাগত প্রমোট করে গেছেন নতুন উঠে আসা ব্যান্ডগুলোকে।

আর তার আগে থেকেই আর্টসেল, নেমেসিস, আর্বোভাইরাসের মত বর্তমানের জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোকে নার্চার করে যাচ্ছেন তিনি। ব্যাপারটা এমন ছিল, শুধু ভালো মিউজিক বানানো ছাড়া আর কোন দিক নিয়ে চিন্তা করতে হতো না তখন উঠে আসা ব্যান্ডগুলোকে। রেকর্ড করার জায়গা না থাকলে সুমনের বাসায় রেকর্ড করার সুযোগ আছে, মিক্স মাস্টারের পয়সা না থাকলে ফ্রি তে মিক্স মাস্টার করে দিচ্ছেন মাইলসের গিটারিস্ট ইকবাল আসিফ জুয়েল, সুমনের স্টুডিওতে বসেই। আর তারপর ক্যাসেট বের করতে হলে জি সিরিজ তো আছেই।

সব আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডের মিউজিসিয়ানরা একসাথে আড্ডা দেয়ার ফলে গড়ে উঠেছিল অন্য রকম এক কমিউনিটি, ফলে অর্গানাইজারের মাধ্যমে শো পেতেও তেমন ঝামেলা পোহাতে হয় না আর ব্যান্ডগুলোকে। এভাবেই স্রেফ একটা বাসা হয়ে উঠেছিলো আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড গুলোর আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার কেন্দ্রস্থল।

ওয়াটসন ব্রাদারস এবং এটেম্পটেড ব্যান্ডের ড্রামার আরাফাত কাজী প্রায়ই বিতর্কিত কথা বলার জন্য বেশ পরিচিত হলেও এ ব্যাপারে বলেছিলেন দারুণ একটি কথা, বিতর্কিত হয়ে ওঠার মত হলেও ভীষণ সত্যও, “চার কোটি টাকা খরচ করে ডিরকস্টারের মত একটা প্রোগ্রামের আয়োজন করে বামবা যদি একটা থ্রাশ মেটাল ব্যান্ড পাওয়ারসার্জকে তুলে আনে, তাহলে সুমন ভাই চার পাঁচ লাখ টাকার চা আর বিরিয়ানি খাইয়ে পাঁচ বছরে কমপক্ষে চল্লিশটা ব্যান্ডকে বের করছে, তাই কেউ যদি স্পন্সর করেই, তাহলে কোন প্রোগ্রামের আগে সুমন ভাইয়ের বাসাকে স্পন্সর করা উচিৎ।”
শুধুই কি ব্যান্ড?
শুধু ব্যান্ডের জন্যই নয়, বেসবাবা সুমন সব ধরণের মিউজিককেই প্রমোট করে গেছেন সব সময়ই। বর্তমানের দেশ সেরা প্রডিউসার এবং কম্পোজার ফুয়াদ এবং রাফার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বিশাল এক ভূমিকা ছিল সুমনের, এ কথা তারা প্রায় সব জায়গায়ই বলে থাকেন।
শরীর বাঁধা হলেও থামেনি পথচলা
গত দশ বছরে ক্যান্সার সহ বিভিন্ন শারিরীক জটিলতা অর্থহীন ব্যান্ডের কার্যক্রমকে ধীর করে দিয়েছে। তবু তিনি যখনই পেরেছেন, আগের মত সাহায্য না করতে পারলেও অসুস্থতা কাটিয়ে যখনই দেশে ফিরেছেন তখনই প্রমোট করেছেন নতুন ব্যান্ড মিউজিসিয়ানদেরকে।

শুধু ঢাকার ব্যান্ডই না, চট্টগ্রাম থেকে আসা বে অফ বেঙ্গলের উঠে আসার পেছনে সুমনের অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন ব্যান্ডের ভোকাল বখতিয়ার। জয় বাংলা কনসার্টের মত শো ‘ তে বে অফ বেঙ্গল এখন ওপেনিং করার সুযোগ পায়।
ব্যান্ডের বাইরেও ট্রেইনরেক থেকে মার্ক ডন এবং নোনতা বিস্কুট ব্যান্ড থেকে মহান ফাহিমকে অর্থহীন ব্যান্ডের ড্রামার এবং গিটারিস্ট হিসেবে নিয়েছেন। নোনতা বিস্কুটের আরেক মেম্বার ইশতিয়াক এখন শিরোনামহীন ব্যান্ডের ভোকাল। এদের সবারই ব্রেক থ্রু বেসবাবার হাত ধরে।
সুমনের বেস গিটার শেখানোর ক্লাসে তার ছাত্ররা তার নাম দিয়েছিল বেসবাবা, কিন্তু শুধু বেসবাবাই নয় গত দুই যুগ ধরে আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডগুলোর জন্য সুমন আসলেই হয়ে উঠেছেন সত্যিকারের এক অভিভাবক, অলিখিত এক গডফাদার।
This Article is about the Saidus Salehin Khaled Sumon who has been a true guardian, an unwritten godfather for underground bands in Bangladesh.
Reference:
Feature Image: Flicker/Ali Wassi
