মেডিকেল কিংবা বুয়েটে চান্স না পেলে জীবন বৃথা, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার না হতে পারলে আর প্রফেশন কোথায়… এমন হাজারটা ভুল ধারণা নিয়ে বসে থাকাদের এক ব্যর্থতার গল্প শোনাই। কনফিউজড হয়ে যাচ্ছেন? শিরোনামে আর্থার কোনান ডয়েল, যিনি শার্লকের মতো বিশ্বের সবচেয়ে মেধাবী চরিত্রের স্রষ্টা, তার আর ব্যর্থতা কোথায়! মজাটা সেখানেই!
শিক্ষাজীবন
ছোটবেলা থেকেই শিল্প সাহিত্যে আগ্রহ থাকা ডয়েল স্কুল শেষে যখন মেডিকেল সায়েন্স পড়বেন বলে ঠিক করলেন, আত্মীয় বন্ধুরা বেশ অবাকই হয়েছিলেন। সবারই ধারণা ছিল ডয়েল আর্টস নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা নেবেন।

এডিনবার্গ ইউনিভার্সিটি থেকে সাফল্যের সাথে ডিগ্রি নিয়ে ডাক্তার হলেন ঠিকই, কিন্তু রোগীর পসার কেন যেন জমলো না। জমেনি বলেই তিনি প্রচুর সময় পেতেন, আর প্রকৃত সাহিত্যচর্চার শুরুও তখন থেকেই। আজ আমরা বলতেই পারি, ভাগ্যিস পসার জমেনি, সময়টা মিলেছে বলেই আমাদের ভাগ্যে ঝুলেছে শার্লক হোমস।
রাজনৈতিক জীবন
এ ছাড়া ব্রিটেনে দুইবার নির্বাচনও করেছেন কোনান ডয়েল। হেরেছেন দুবারই, তবে বেশ ভালো পরিমাণ ভোটও কিন্তু পেয়েছিলেন। অবশ্য এ সাফল্যের বেশীরভাগটাই যে শার্লকের জনপ্রিয়তার জোরে, তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
চিকিৎসা পেশায় ব্যর্থতা
সাহিত্যে মন পড়েছিল বলেই ডাক্তারী পেশাতে সফল হতে মনোনিবেশ করেননি, এমন ধারণা করারও কিন্তু উপায় নেই। তিনি সত্যিই চেষ্টা করেছেন পেশাগত জীবনে সফল চিকিৎসক হতে। তাই যখন পসার জমছে না, তখন চোখের উপর গবেষণা জার্নাল প্রকাশ করে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন এবং চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পাশ্চাত্যে এখন যেমন সবচেয়ে বেশী ব্যস্ততা ও পয়সার আনাগোনা ডেন্টিস্টদের চেম্বারে, উনবিংশ শতকের শেষের দিকে সে সফলতার ভীড় ছিল চক্ষু বিশেষজ্ঞদের দরজায়। তবে ডয়েলের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি, বরং উত্তপ্ত কড়াই থেকে যেন জলন্ত চুলায় গিয়ে পড়েছিলেন। চক্ষু চিকিৎসক ডয়েলের চেম্বারে একজন রোগীরও দেখা মেলেনি কখনো।

সাহিত্যে মনোনিবেশ
জীবিকার তাগিদেই শেষ পর্যন্ত ডাক্তারী ছেড়ে পুরোদস্তুর সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন ডয়েল। স্কটিশ লেখক স্যার আর্থার কোনান ডয়েল শার্লকের চারটি উপন্যাস ও চুয়ান্নটি ছোটগল্প ছাড়াও আরো বহু বিচিত্র সাহিত্য উপহার দিয়েছেন পাঠককে। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার নামে ডয়েল সৃষ্ট আরেকটি চরিত্র প্রথম দিকে শার্লকের পাশাপাশি দারুণ জনপ্রিয়ও হয়ে উঠেছিল সেই সময়ে। এছাড়াও সায়েন্স ফিকশন, নাটক, রোম্যান্স, কবিতা, ঐতিহাসিক উপন্যাস, স্মৃতিকথা আর কিছু নন-ফিকশন রচনাও আছে তার।
নাইটহুড উপাধি লাভ
বর্তমান সময়ে এসে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য, ডয়েল ব্রিটেনের রাণীর কাছ থেকে নাইটহুড উপাধি পেয়েছেন বোয়ার যুদ্ধ নিয়ে নন-ফিকশন লেখাগুলোর জন্য। তার নামের আগে ‘স্যার’ উপাধি যুক্ত এ কারণেই, শার্লক হোমসের সৃষ্টির জন্য নয়।

অবশ্য সময়ের সাথে সাথে শার্লকের ছায়ায় ঢাকা পড়ে তার অন্য সব সৃষ্ট সাহিত্য। এ নিয়ে ভীষণ আক্ষেপও ছিল একসময় ডয়েলের।
শার্লক হোমসের বিদায় ও পুনরুত্থান
শার্লক হোমসকে নিয়ে লিখতে গিয়ে নতুন কোন সাহিত্যে মনোযোগ দিতে পারছেন না বলে ডয়েল নিজের মাকে চিঠিতে জানান, তিনি শার্লক হোমসকে খুন করতে চান, কারণ শার্লক তার সমস্ত সাহিত্য সৃষ্টির প্রতিভাকে প্রতিনিয়ত খুন করে ফেলছে। আর তারপর তা করেও ফেলেন, ‘দ্য ফাইনাল প্রবলেম’ গল্পে হাজার হাজার পাঠকের মন ভেঙে শার্লক হোমসকে খুন করালেন।
দীর্ঘদিন শার্লক হোমস নিয়ে আর লেখেননি তারপর, কিন্তু ফিরতে হলো একসময় পাঠকদের চাহিদা ও ভালবাসার চাপেই, ফেরাতে হলো শার্লক হোমসকে। ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য এমটি হাউজ’ গল্পে অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে এলেন শার্লক হোমস। মজার ব্যাপার হচ্ছে, শার্লককে ফিরিয়ে আনার জন্য পাঠকদের আন্দোলন শুরুর নেপথ্যে এবং পুরোভাগের নেতৃত্বে ছিলেন ডয়েলের মা নিজেই, ছেলের সৃষ্ট চরিত্রের এমনই ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

শার্লক হোমসের বাস্তব অস্তিত্ব
অনেকেরই ধারণা, শার্লক চরিত্রটি আর্থার কোনান ডয়েল নিজেকে কল্পনা করেই লিখেছেন। ভাবাটাই স্বাভাবিক, শার্লকের এমন তীক্ষ্ণ সব বুদ্ধির ছড়াছড়ি তো লেখকের কলমের জোরেই। আসল ঘটনা কিন্তু ভিন্ন, শার্লক হোমস চরিত্রটি ডয়েল তৈরী করেছেন তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শিক্ষক প্রফেসর জোসেফ বেলের ছায়ায়। সাধারণ পাঠকরা এ খবর না জানলেও জোসেফ বেলকে চিনতেন এমন সবাই তা ভালোভাবেই টের পেয়েছিলেন। এক কনফারেন্সে তো একজন ডয়েলকে সবার সামনে জিজ্ঞেস করেই বসেছিলেন, “শার্লকই কি আমার বন্ধু জো?” বলা বাহুল্য, জোসেফ বেলকে বন্ধুটি জো বলেই সম্মোধন করতেন।
আর্থার কোনান ডয়েলের গোয়েন্দাগিরি
গোয়েন্দা গল্প লেখকের পাশাপাশি সত্যিকারের গোয়েন্দাগিরিতেও আর্থার কোনান ডয়েল দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে অন্তত দুটো দুর্দান্ত কেসের সমাধান করেন। জর্জ এডালজি নামক এক ভদ্রলোক হুট করে ফেঁসে গিয়েছিলেন পশু নির্যাতনের কেসে, পুলিশের তথ্য-প্রমাণ সবই তার বিরূদ্ধে। ডয়েলের কাছে খটকা লেগেছিল পত্রিকায় প্রকাশিত বিবাদীর ছবি দেখে, এমন দূর্বল শারিরীক গঠনের একজন কী করে এমন ধরণের পশু নির্যাতনের দৈহিক ক্ষমতা রাখে! তারপর যুক্তিতর্ক দিয়ে একসময় তার বিরুদ্ধে আনীত প্রমাণগুলোও ঠিক না বলে পরিষ্কার করে দেন বিচারকদের সামনে। মুক্তি পান জর্জ এডালজি। তবে জর্জের মতো সবার ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়, অস্কার স্ল্যাটারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল এক মহিলাকে খুন করার। ডয়েল এখানেও দেখালেন, প্রমাণগুলো সবই ভুল। খুনের সময় তিনি খুনের জায়গাতেই ছিলেন না। কিন্তু ততদিনে স্ল্যাটারের রায় হয়ে গেছে। সাড়ে ১৮ বছর কারাভোগের পর মুক্তি মেলে অস্কার স্ল্যাটারের।
এমন অসংখ্য অদ্ভুতুড়ে ঘটনা উদ্ভটভাবে মিলেছে আর্থার কোনান ডয়েলের পুরো জীবন জুড়ে। চক্ষু চিকিৎসক হিসেবে ব্যর্থ ডয়েলের সৃষ্টি শার্লক শুধু চোখ দিয়ে দেখেই নাড়িনক্ষত্র বলে দিতে পারতেন। আবার শার্লকের প্রতিটা কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করতেন অথচ শার্লকের স্রষ্টা আর্থার কোনান ডয়েলের আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাস ছিল ভয়ংকর রকমের।
আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকর্ষণ
আরেক বিখ্যাত সাহিত্য চরিত্র ‘ড্রাকুলা’র স্রষ্টা ব্রাম স্টোকারের সাথে আর্থার কোনান ডয়েলের সম্পর্ক নিয়ে ‘শার্লোকিয়ান’ নামে আস্ত একখানা উপন্যাসই আছে। তবে তার কতখানি সত্যি আর কতখানি ফিকশন তার নিশ্চয়তা না থাকায় সেদিকে বরং আজ আর না যাই। তাছাড়াও ডয়েলের অতিমানবিক বিষয়ে বিশ্বাসের প্রচুর গল্প চালু আছে।
১৯১৭ সালের দিকে ব্র্যাডফোর্ড শহরের কটিংলিতে দুই বোনের তোলা পাঁচটি ছবিতে ছোট ছোট পরীও দেখা যায়। ফটো এডিটের ব্যাপার তো তখনকার দিনে কারো কল্পনাতেও ছিল না, তাই বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল ছবিগুলো। পরে ওদের বাবা অবশ্য বলেছিলেন, বড় বোন এলসি ছবির কিছু কিছু কারিকুরি শিখেছিল। সম্ভবত এলসি নিজেই ছবিগুলোতে আলো-ছায়ার কারসাজিতে পরী বানিয়েছিল। কোনান ডয়েল কিন্তু ছবিগুলোর সত্যতা মেনে নিয়েছিলেন। এতোই বিশ্বাস জন্মেছিল তার মনে যে সেই ছবিগুলো নিয়ে তিনি রীতিমতো একটি বইও লিখেছিলেন।

এখনকার ম্যাজিক শো’তে অনেক ম্যাজিশিয়ানই হ্যান্ডকাফ পরা বা বিভিন্ন বন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার ম্যাজিক দেখায়। এইসব ম্যাজিকের জনক বলা হয় হ্যারি হুডিনিকে। সেই সময় প্রচুর নাম করেছিলেন ভদ্রলোক, ডয়েল তার ম্যাজিকে মুগ্ধ হয়েছিলেন, বেশ ভালো বন্ধুত্বও হয়ে গিয়েছিল দুজনের। জীবনের শেষ দিকে হ্যারি স্বীকার করেন তিনি অলৌকিক কিছু করতেন না, সবই কৌশল। এতে কোনান ডয়েল এতটাই কষ্ট পান যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বেরই ইতি টানেন।
তবে তার আধ্যাত্মিকতার চর্চা থেমে ছিল না। অলৌকিক, ব্যাখ্যাতীত সবকিছুর প্রতিই তার ছিল অদম্য আগ্রহ ও বিশ্বাস। দেশ, মহাদেশ পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছেন এই আগ্রহের দরুন। জীবনের শেষ দিকে যখন বিভিন্ন বয়সজনিত জরায় কবলিত, এ্যাঞ্জিনা প্র্যাক্টেরিস রোগে পরিপূর্ণ বিশ্রামের প্রেসক্রিপশন উপেক্ষা করে ছুটে যান নেদারল্যান্ডে আধ্যাত্মবাদী বক্তৃতার এক সফরে, ১৯২৯ সালে।
শেষ যাত্রা
পরিবার পরিজনদের সফরে বাঁধা দেয়া অভিযোগ অনুযোগের জবাবে ‘জন্মিলে মরিতে হবে’ ধরণের স্বান্তনা দিয়ে সফরে যাওয়া ডয়েল লন্ডনে ফিরে আসেন বুকে ব্যথা নিয়ে। তখন থেকেই শয্যাশায়ী, আর কখনো উঠে দাড়াতে পারেননি শার্লকের স্রষ্টা। ১৯৫৯ সালের আজকের দিনে (২২ মে) জন্ম নেয়া এই মহান লেখক ‘জন্মিলে মরিতে হবে’ উক্তির শর্ত পূরণ করে পরপারে পাড়ি জমান ১৯৩০ সালেই, জুলাই মাসে।
স্যার আর্থার কোনান ডয়েল তার লেখায় শার্লককে সৃষ্টি করেছেন, একসময় তাকে খুনও করেছেন। আবার তাকে পুনর্জন্ম দিয়েছেন নিজেরই লেখায়। ডয়েলকে চলে যেতে হয়েছে, কিন্তু শার্লক হোমস এখনো পুরোমাত্রায় জীবিত ও তরুণ, শতাব্দী পেরিয়েও পৃথিবীর সবচেয়ে মেধাবী ও বুদ্ধিমান সত্তা।
References:
- Interesting Facts about Arthur Conan Doyle
- Clever Facts about Sir Arthur Conan Doyle, The Man Behind Sherlock Holmes
Feature Image: Arthur Conan Doyle Encyclopedia
