দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় দশ বছর পর কানাডা সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলো, পৃথিবীর সবচাইতে উন্নত ফাইটার বিমান তারা তৈরি করবে। পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে তারা নির্মাণ করেছিলো অত্যাধুনিক জেট বিমান, যেটা ছাড়িয়ে গিয়েছিলো সেসময়ের প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সীমা। নাম ছিলো এভ্রো অ্যারো (Avro Arrow)। কিন্তু এই অত্যাধুনিক বিমান বানানো যত দ্রুততার সাথে তার দ্যুতি ছড়িয়েছিলো ঠিক তত দ্রুতই হয়েছিলো এটির পতন।
মূলত সেসময় কানাডা সুপরিচিত ছিলো তাদের অত্যাধুনিক বুশ প্লেনের জন্য। এইসব বিমানগুলো অনায়েসেই টেক অফ করতে পারতো অমসৃণ জায়গা কিংবা ভয়ংকয় সব সিচুয়েশনকে অগ্রাহ্য করেই। তাছাড়া ১৯৩০ দশকের শেষের দিকে তারা বৃটিশ নকশার বিমান তৈরি করাও শুরু করেছিলো। যে বিমানগুলোর বড় একটা অংশ ছিলো যুদ্ধে ব্যবহৃত আইকনিক ডিজাইনের। যেমনঃ Hawker Hurricane fighter, Avro Lancaster bomber.

কিন্তু বিধিবাম, উচ্চাভিলাসী কানাডিয়ান রাজনীতিবিদ ও প্রকৌশলীদের তাতে মন ভরলো না। তারা সিদ্ধান্ত নিলো পৃথিবীর সবচাইতে সেরা বিমান বানানোর। ভাষ্যমতে অন্যের নকশায় কাজ করতে করতে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে পড়েছিলো কানাডার তৎকালীন নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতাগণ। এবার নিজস্ব নকশায় তৈরি হবে নিজেদের বিমান। আর তাদের এই স্বপ্ন পূরণ করবে যুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বিমান তৈরির কারিগর এভ্রো এয়ারক্রাফট (Avro Aircraft)।
ফার্মটির প্রকৌশলীরা নির্দেশ পেয়েই কাজে নেমে পড়লেন। বৈপ্লবিক জেট ফাইটার, কমার্শিয়াল বিমান, এমনকি একটি শূণ্য যান বিমানেও কাজ করেছিলেন তারা আগে। কানাডাকে নিয়ে এসেছিলেন জেট বিমানের যুগের সামনের সারিতে৷ ফলে স্বপ্নটা সত্যি করার ভার যৌক্তিকভাবেই তাদের উপর পড়েছিলো। তারপর তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এলো অ্যারো (Arrow)।

ছবিসূত্রঃ The Globe and mail
১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর। ১৪০০০ মানুষের চোখের সামনে টরোন্টোতে প্রথমবারের মতো উপস্থিত হলো সুন্দর, বিশাল, শুভ্র, ডেল্টা-উইং এর একটি বিমান। বিমানটা ছিলো এভ্রো এরো’র ইন্টারসেপ্টর। বর্তমানের ইউরোফাইটার টাইফুনের চেয়ে তিনগুণ দীর্ঘ ও প্রশস্ত। আর গতিতে আরও দ্রুত। মূলত কানাডাকে বিমানচালনায় পরাশক্তি করার জন্য এটা ছিলো ২৫০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার (বর্তমান ইউএস ডলারে ১৫৮ বিলিয়ন সমপরিমাণ) প্রস্তাবিত মূল্যের এক কার্যক্রম।
এভ্রো এরোর এই প্রজেক্টটা সত্যিই বিশ্ব কাঁপানো একটা প্রজেক্ট ছিলো। ছিলো এর প্রকৌশলীদের সর্বোচ্চ শ্রমে গড়ে ওঠা একটা স্বপ্নের বাস্তব রূপ। কিন্তু এরপর খুব শীগ্রই কানাডিয়ানরা জানতে পারলো সুপারসনিক যুগ বিমান তৈরির কার্যক্রমগুলোকে এতোটাই ব্যয়বহুল করে দিয়েছে যে, হাতেগোনা মাত্র কয়েকটা দেশের পক্ষে সেগুলো বাস্তবায়ন ও সেভাবে পরিচালনা করে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। এবং দুর্ভাগ্যক্রমে, কানাডা সেই মুষ্টিমেয় দেশের তালিকায় নেই।

১৯৫৯ এর ফেব্রুয়ারীর ঘটনা। এভ্রো এয়ারক্রাফট তখন মাত্র নিজেদের পঞ্চাশ বছর (১৯০৯-১৯৫৯) পূর্তির বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে শেষ করেছিলো। ২০শে ফেব্রুয়ারী শুক্রবার (যা পরবর্তীতে ব্ল্যাক ফ্রাইডে হিসেবে পরিচিত হয়েছিলো) এভ্রো এয়ারক্রাফটের কারখানায় থাকা লাউডস্পিকার হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠলো। হাজারো শ্রমিক শুনতে পেলো, ঘোষক তৎকালীন নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জন ডিফেনবেকার’কে উচ্চারণের অযোগ্য গালি দিয়ে বলছে, লোকটা (জন ডিফেনবেকার) পুরো এরো কার্যক্রম বাতিল করে দিয়েছে। সেদিন সাড়ে চৌদ্দ হাজার দক্ষ নারী ও পুরুষ তাদের চাকরি হারিয়েছিলেন। এই প্রকৌশলীদের অনেকে ‘ব্রেইন-ড্রেইন’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে চলে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। আর এদের মাঝে ৩২ জনের ‘এভ্রো গ্রুপ’ এর বিশেষ ভূমিকা ছিলো নাসার এপোলো প্রোগ্রামে। যেটা চাঁদে অবতরণের প্রতিযোগিতায় সোভিয়েত রাশিয়াকে হারিয়ে দিয়েছিলো। আয়রনিক, তাই না?
আরও পড়ুনঃ দুনিয়া বদলে দিয়েছিলো যে অ্যাভিয়েশন
কেন বার্নেস নামক এভ্রো এরো প্রজেক্টের একজন সিনিয়র নকশাকার ছিলেন। অনেক কানাডিয়ানদের মতোই প্রজেক্টটার এমন দুর্ভাগ্য তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই এভ্রো এরোর ব্লুপ্রিন্ট ধ্বংস করে ফেলার নির্দেশ পেলেও সেটা অমান্য করলেন কেন বার্নেস। সেগুলোকে গোপনে তার বাড়ির বেসমেন্টে লুকিয়ে ফেললেন। যা পরবর্তীতে তার মৃত্যুর পর তার ভাগ্নে খুঁজে পেয়েছিলো। দু’ বছর আগে পত্রিকার শিরোনাম হয়েছিলো এ খবর। আর তা পড়ে মানুষ আশা করেছিলো, একইভাবে কোন এক অলৌকিক ঘটনায় হয়ত ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে গেছে একটা বিমানও।

এভ্রো এয়ারক্রাফটের নীরব কারখানার সামনে ধ্বংস হওয়া এভ্রো এরোর শেষ পরিণতির সাক্ষী কেবল একটা সাদাকালো ছবি। সবচেয়ে সাধের প্রজেক্টের এমন করুণ পরিণতির তিন বছর পরে কোম্পানিটি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ চাকরি হারায় তখন।
কানাডা এভিয়েশন অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধায়ক এরিন গ্রেগরি বলেন, ‘একটা বিমানের প্রতি নিজেদের এতটা উৎসর্গ করার পরেও সেটাকে কাজে লাগতে না দেখতে পাওয়ার মত দেশের উদাহরণ আপনি খুব একটা পাবেন না।’ ‘কানাডিয়ানদের জন্য এটা সুযোগ হারিয়ে ফেলার একটা অনুভূতি। তাছাড়া সাথে এমন একটা ধারণা ছিলো- আমরা ক্ষুদ্র জনসংখ্যার এক বিশাল দেশ যার উদ্ভাবনী সাহস এতবেশী যে, কিছুক্ষেত্রে সামর্থ্যের বাইরে এগিয়ে যাই। এভ্রো এরো এমনই একটা কার্যক্রম ছিলো আমাদের। বিমান চালনা প্রযুক্তির উচ্চতা ছিলো এটা। আর এভ্রো ছিলো কানাডার উচ্চ প্রযুক্তিগত বিমান কারখানা। তবু সরকার এটাকে ব্যর্থ করে দিলো।’
কানাডিয়ানদের মাঝে পুরোনো কৌতুক আছে একটা, এভ্রো এরোর বাতিল হওয়াটা ছিলো আমেরিকার জন্য সবচেয়ে ভালো খবর। কিছু কিছু কানাডিয়ান তো এক কাঠি সরেস। তারা সরাসরি তাদের দক্ষিণী প্রতিবেশীকে (আমেরিকা) দায়ী করে। দোষারোপ করে এভ্রোর এরোর এমন অকাল করুণ পরিণতির জন্য।

‘প্রজেক্টটা বাতিল হলো যখন ততদিনে এর মোট খরচ কানাডিয়ান ডলারে ২৫০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে,’ এরিন গ্রেগরি বলেন। ‘আর এটা অবশ্যই কানাডার মতো ছোট একটা দেশের জন্য অনেক বিশাল একটা অঙ্ক। তাছাড়া আরও বাড়তি কয়েক মিলিয়ন প্রয়োজন ছিলো ওতে। তাই বাতিলের সিদ্ধান্তটা নেয়া সহজ ছিলো।’
১৯৫৯ এর সেই বিখ্যাত ব্ল্যাক ফ্রাইডে উপাধি পাওয়া শুক্রবারে লাউডস্পিকারের ঐ জীবন্ত হয়ে ওঠার সময় পর্যন্ত কোম্পানিটির কাছে প্রস্তুত ছিলো এভ্রো এরোর ওড়ারযোগ্য পাঁচটি প্রোটোটাইপ। আর ডিফেনবেকার-এর সরকার সেই সবগুলোই ভেঙে ফেলার আদেশ দিয়েছিলো৷ যদিও আমেরিকা চেয়েছিলো সম্পূর্ণ হওয়া সবগুলো বিমান কিনে নিতে। বৃটেন অনুরোধ করেছিলো সুপারসনিক ফ্লাইট নিয়ে গবেষণার কাজে এভ্রো এরোর কিছু বিমান ব্যবহার করার অনুমতি পেতে। কিন্তু সরকার তার সিদ্ধান্তে অটল। বৃটেন পেলো স্রেফ একটা ইরোকুইস ইঞ্জিন (এভ্রো এরোতে ব্যবহারের জন্য তৈরি)। আমেরিকা কিছুই নয়।
যাইহোক, নাসা কিন্তু একটুও সময় নষ্ট করেনি। প্রজেক্টটি বাতিল হওয়ার কয়েক ঘন্টার মাঝেই এভ্রোর প্রকৌশলীদের সাথে যোগাযোগ করলো তারা। ৩২ জনকে বেছে নিলো তাদের সাথে মার্কারি, জেমিনি ও এপোলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রামে কাজ করার জন্য৷ যা পরবর্তীতে কতটা সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিলো তা আমাদের সবারই জানা।

কানাডিয়ান স্পেসফ্লাইট হিস্টোরিয়ান এবং ‘ফাইটিং ফর স্পেস: টু ফাইলটস এন্ড দেয়ার ব্যাটল ফর ফিমেল স্পেসফ্লাইট‘ বইয়ের লেখিকা শিরা টেইটেল এর মতে, ‘কৃতিত্ব দাবী করার ক্ষেত্রে কানাডিয়ানরা অতিরিক্ত বিনয়ী। কিন্তু এপোলো যুগের জটিল সিদ্ধান্ত সব নেয়া মানুষগুলোর অধিকাংশই ছিলো কানাডিয়ান। আমার মনে হয় এই মস্তিষ্কগুলো (এভ্রোর প্রকৌশলীরা) না থাকলে নাসার পক্ষে চাঁদে যাওয়া একটু বেশিই কঠিন হতো।’
অন্টারিওর মাল্টনে ১৯৫০ সালে উদ্ভাবন করা সর্বোচ্চ প্রযুক্তির বিমান এভ্রো এরো হতে পারতো অনেক কিছু। হতে পারতো বিশ্বের সবচাইতে দ্রুততর বিমান, সোভিয়েত বোমারুদের বিরুদ্ধে সেরা প্রতিরক্ষা, বিমান শিল্পে কানাডাকে সামনের সারিতে নিয়ে যাওয়ার একটা মাধ্যমসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ একাধিক অবস্থানে রাজত্ব করা একটি প্রযুক্তি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেটা হলো ৪০০ মিলিয়ন ডলার দামী ধাতুর ভাঙা স্তূপ। আর কিংবদন্তিতুল্য একটা স্বপ্নের অকালে ভেঙে যাওয়া হাহাকার যা কানাডাবাসীকে আজও তাড়া করে ফেরে।
References:
- Hunting for a Canadian Legend: the Avro Arrow Jet Fighter
- The record-breaking jet which still haunts a country
- The Avro Arrow: Canada’s Broken Dream
- Black Friday 1959, Avro Arrow- the death of a future legend
Feature image source: BBC
