ক’দিন আগে নির্বাচনে জিতেই জো বাইডেনকে সবচেয়ে বেশি জটিলতা পোহাতে হয়েছে চীনকে নিয়ে। আগের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছর তো চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ করেই কাটাতে হয়েছে। কিন্তু চীনের এই উত্থানপর্ব কেবল একদিনের না। প্রায় চার দশক আগের এক ডিসেম্বরে চীন এমন এক নেতাকে ক্ষমতায় এনেছিলেন, যার হাত ধরেই দেশটি এক অসামান্য পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করে। তবে সেদিনের সেই ক্ষমতার পটপরিবর্তন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেমন কিছুই জানতো না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র না, খোদ চীনের অনেকেই জানতেন না এই মানুষটাই তাদের নতুন নেতা হতে চলেছেন। জানার মত সুযোগও ছিল না। কেননা রীতিমতো দেবতা বনে যাওয়া মাও সে তুং এর বিরোধীতা করে তাকে সরতে হয়েছিল অনেকটা দূরে। তবে মাও এর মৃত্যুর পর তার হাতেই হয়েছে চীনের উত্থান। বলছিলাম দেং জিয়াও পিং এর কথা। আজকের দিনের পরাক্রমশালী রাষ্ট্র চীনের স্বপ্নদ্রষ্টা বলা হয় যাকে।
মাও সে তুং; দেবতা থেকে মানুষ
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান হয়ে মাও সে তুং যখন দেশের শাসনকর্তা, তখন তিনি একপ্রকার দেবতার সম্মানই পেয়েছিলেন। মাও এর স্বপ্ন ছিল চীনকে রাতারাতি উন্নত বিশ্বের এক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা। সেসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রু ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তাধারা ছিল গণতান্ত্রিক। অন্যদিকে, সোভিয়েতের ভিত্তি ছিল কমিউনিজম। চীনের কমিউনিস্ট নেতা হয়ে মাও গেলেন সোভিয়েতে। গিয়েই মুগ্ধ হলেন সোভিয়েতের অগ্রগতি দেখে। দেশে ফিরে খুঁজে নিলেন নিজের যোগ্য প্রতিদ্বন্দী। দেশের মানুষকে শোনালেন আশার বাণী,
‘আগামী ১৫ বছরের মাঝেই গ্রেট ব্রিটেনকে টপকে যাবে চীন।’

মাও এর ঘোষণা জাদুর মত কাজ দিলো পুরো চীনে। একযোগে সবাই নামলো মাও এর ডাকে সাড়া দিতে। যারা বিরোধী, তাদের জন্য রইলো সশস্ত্র বাহিনী। আর বাকিদের নিয়োগ দেয়া হলো শ্রমে। মাও এর নীতিতে চীন চলছিল দুইভাবে। প্রথমত কৃষিজমিকে এক করে দেয়া হলো। ব্যক্তি মালিকানা রইলো না কোনভাবেই। তার ধারণা ছিল যৌথ চাষাবাদে ব্যাপক ফলন হবে। যার কারণে বিদেশে প্রচুর খাদ্যশস্য রপ্তানি করা যাবে। কিন্তু প্রথমদিকে ধারণা সত্য হলেও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে উৎপাদন। কিন্তু প্রাদেশিক নেতারা মাওকে সেই কথা জানালেন না। মাও এর সবচে বড় ভুল ছিল তিনি চাটুকারদের বিশ্বাস করতেন। স্বভাবতই উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে জানানো হত তাকে। মাও সে অনুযায়ী খাদ্যশস্য বিক্রি করার চুক্তি করতেন। কিন্তু এতে করে দেখা দেয় বিশাল এক দূর্ভিক্ষ।
মাও এর দ্বিতীয় ভুল ছিল দেশে প্রচুর পরিমাণ স্টিল ফ্যাক্টরি নির্মাণ। তার বদ্ধমূল ধারণা ছিল, দ্রুত শিল্পায়ন করলেই দেশের উন্নয়ন অবশ্যম্ভাবি। আর সেজন্য প্রচুর লোহা দরকার। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ চাহিদা মেটানোর মত দক্ষ জনশক্তিও চীনের ছিল না। যার ফলে চীনে দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। দেবতা মাও সে তুং নেমে আসেন মানুষের পর্যায়ে।
মাও এর মৃত্যু এবং দেং জিয়াও পিং এর ক্ষমতা গ্রহণ
১৮ ডিসেম্বর, ১৯৭৮। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ১১তম কেন্দ্রীয় কমিটির ৩য় বৈঠক। বৈঠকে নিয়ে আসা হলো দেং জিয়াও পিং কে। সেই দেং, যাকে বছরখানেক আগেই কেন্দ্রীয় রাজনীতি তো বটেই, প্রাদেশিক রাজনীতি থেকেও ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। দেং জানতেন, মাও খুব বড় ভুল করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দেশজুড়ে চাটুকারদের মাঝে তার কিংবা ঝো এন লাইয়ের মত প্রবীণ নেতাদের কথা শোনার সময়টা অন্তত মাও এর ছিল না। সেই দেংকেই এবার দেয়া হলো পার্টির দায়িত্ব। চীন শুরু করলো নতুন এক যাত্রা।

দেং জিয়াও পিং প্রথমেই চীনকে নিয়ে গেলেন মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে। দেখা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং সেক্রেটারি অফ স্টেট হেনরি কিসিঞ্জারের সাথে। তিনি জানতেন, উন্নয়নের জন্য দরকার বৈশ্বিক মিত্রতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার। সেইসঙ্গে, এও ধারণা ছিল, সোভিয়েতের পতন অবশ্যসম্ভাবী। একারণেই সমমনা দেশ ফেলে, বিপরীতধর্মী মার্কিনীদের সাথেই বাণিজ্য চুক্তি করলেন দেং। ফলটাও এলো হাতেনাতে। পরের বছরের নভেম্বর মাসেই ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট জিম কিম জানালেন, ‘চীন তার মাথাপিছু আয় ২৫ গুণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া ৮০০ মিলিয়ন চীনের নাগরিক দারিদ্র্যসীমা থেকে উঠে এসেছেন।’
দেং এর সাফল্যের পিছনে
দেং জিয়াও পিং এর সাফল্যের পিছনে বড় কারণ ছিল কৃষি ও শিল্পখাতকে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তর করা। মাও এর অধীনে সবই ছিল রাষ্ট্রীয়। কিং তিনি এসেই সকলকে দিলেন কর্মের স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতার গুণেই মানুষের মাঝে কর্মস্পৃহা বাড়লো বহুগুণে। দ্রুতই চীন বুঝতে শিখলো তাদের দেশের বিশালত্ব। কৃষিকাজ ছড়িয়ে গেল সারা দেশে। আর শিল্পক্ষেত্রও ইজারা দেয়া হলো। কিছু ক্ষেত্রে দরপত্র ডেকে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলেন দেং। কেবল লৌহ উৎপাদন না, বরং দক্ষতাকে প্রাধান্য দিলেন তিনি। সেই সঙ্গে দেয়া হলো পর্যাপ্ত স্বাধীনতা।
৪১ বছর পর খুলে দিলেন সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ। চীনকে তারপর থেকে আর পিছনে ফিরে দেখতে হয়নি।

মিখাইল গর্বাচেভ দম্ভ করেই বলেছিলেন, ১৫ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে চীন। মাও সে তুং সেই সুরেই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন ব্রিটেনকে। তবে ১৬ বছর পর কেউই সফল হননি। সোভিয়েত হলো পতিত এক পরাশক্তি, মাও দেখলেন ব্যাপক দুর্ভিক্ষ। তবে ছোটখাটো গড়নের দেং জিয়াও পিং টিকে গেলেন। যিনি না থাকলে, হয়ত ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা জো বাইডেনরা আজ একজন প্রতিদ্বন্দী কম পেত।
This article is about how Deng Xiao Ping changed the overall socio-economic scenario of China right after the death of Mao Ze Dong.
References:
- https://www.washingtonpost.com/news/monkey-cage/wp/2018/12/19/40-years-ago-deng-xiaoping-changed-china-and-the-world/
- https://www.britannica.com/biography/Deng-Xiaoping
- https://origins.osu.edu/review/man-who-re-invented-china
Feature Image: Money Week
