“মাখতে মাখতে গমের আটা, ঘামে ভিজল আমার গা_টা।”
কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন স্বভাব কবি, মন চাইলেই বেঁধে ফেলতেন কবিতা কিংবা ছড়া।বর্তমানে পাঠ্যবইয়ের বদৌলতে এই বিদ্রোহী কবি যেমন আমাদের কাছে অনেক সমাদৃত, তেমনি সেই আসানসোলের রুটির দোকানের দুখু মিয়া আমাদের কাছে ততটাই অবহেলিত। পাঠ্যবইগুলোতে অনেকটাই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে সেই রুটির দোকানে কাজ করার সময় ফুটে উঠা কবির চমৎকার ছড়াগুলো। বিদ্রোহী মনোভাবের আড়ালে একটা স্বভাব কবি যে লুকিয়ে আছে সেটা হয়ত এই প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অজানা।হালের পাঠ্যপুস্তকের এ করুণদশা অবশ্য আমাদের ঐতিহ্যই ধরে রেখেছে, তবে নজরুল ইসলামের সময়ও অবস্থা ভিন্ন ছিল না।

সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের কথা, যুদ্ধ শেষে নজরুল সবে দেশে ফিরেছেন, কলকাতায় অবস্থান করার সময় তার কাছে আলী আকবর নামে এক ভদ্রলোক এলেন পাঠ্য বই প্রণয়নের পান্ডুলিপি কবিকে দেখাতে। পান্ডুলিপি শেষ করে নজরুল ইসলাম বেজার মুখেই আলী আকবরকে বলেছিলেন, “আপনার পাণ্ডুলিপির ছড়াগুলো ছোটদের উপযোগী হয়নি। যদি বলেন তো আমি একটা ছড়া লিখে দিতে পারি।” এ যেন না চাইতেই আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া, সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুরোধ করলেন কবিকে লিখে দেওয়ার জন্য। নজরুল ইসলামও দু’খিলি পান মুখে পুরে তৎক্ষনাৎ লিখে ফেললেন বিখ্যাত ‘লিচু চোর’ ছড়াটি।
“বাবুদের তালপুকুরে
হাবুদের ডালকুকুরে
সেকি ব্যস করলো তাড়া
বলি, থাম-একটু দাঁড়া।”
কবির ছেলেবেলা
নিজের ছেলেবেলাটা একদিকে যেমন কেটেছে ভীষণ ডানপিটে দুরন্তপনায়, তেমনি আর্থিক কষ্টেও। অর্থাভাবে পড়াশোনা বন্ধ করে কাজে নেমে পড়তে হয় তার। তারপর লেটো দলের গান, আসানসোলে রুটির দোকান থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সৈনিক হিসেবেও অংশগ্রহণ করেছিলেন।

শৈশব নিয়ে মনের ভেতর অভিমান ছিল বলেই হয়তো কবি নজরুল সারাজীবন শিশুর মতো সারল্য বজায় রেখেছেন, আর শিশুদের ভালবেসেছেন প্রাণভরে। শিশুদের আশেপাশে এলেই নজরুল দারুণ প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠতেন। বড়দের মতোই বাচ্চাদের কথা ও ইচ্ছেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন।
ছোটদের নজরুল
একবার ছোট্ট ফুটফুটে এক মেয়েকে বলেছিলেন, খুকি তোমাকে কলকাতা শহরের এমাথা ওমাথা ঘুরিয়ে দেখাবো। ছোট্ট মেয়েটি সম্ভবত বিশ্বাস করতে পারেনি কবির কথা। বড়রা তো কত রকম কথাই বলে থাকে ছোটদের প্রলোভনই দিতে, সব কথা কি আর রাখে? কিন্তু বড় হলেও নজরুলের মনটা তো শিশুসুলভ সারল্যে পরিপূর্ণ, তিনি কথা রেখেছিলেন।
সত্যি সত্যি একদিন বেরিয়ে গিয়েছিলেন খুকীকে নিয়ে। একটা ট্যাক্সি সারাদিনের জন্য ভাড়া করে খুকীর সঙ্গে নজরুলও সমস্ত কলকাতা ঘুরে দেখলেন। বিকেলের দিকে ট্যাক্সি ভাড়া দিতে গিয়ে দেখেন পকেটে একটা পয়সাও নেই। কবি মানুষের বেখেয়ালি মন, হতেই পারে এমন। কিন্তু উপায়টা কী, ট্যাক্সিওয়ালাকে বিদেয় তো করতে হবে। শেষে সেই ট্যাক্সি নিয়েই ছুটলেন বন্ধুদের বাড়ি বাড়ি। কয়েকজনের কাছ থেকে ধার করে করে তবে মিটলো ট্যাক্সি ভাড়া, মিটলো কবি ও খুকী দুজনের মনের খায়েশও।
আরও পড়ুনঃ শতবর্ষ পেরিয়ে সত্যজিৎ – সিনেমার পেছনের ছবি
শিশুদের জন্য ছড়া-গান
শিশুদের জন্য প্রচুর ছড়া-গানও লিখেছেন। জানলে অবাক লাগে, নজরুলের প্রায় সব ছড়া-কবিতা লেখার নেপথ্যে অদ্ভুত সব গল্প রয়েছে। কবিকে নিয়ে রচিত বিভিন্ন স্মৃতিকথায় সেসব গল্পের খোঁজ পাওয়া যায়।
কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতা ‘খুকী ও কাঠবেড়ালী’, প্রায় সবাই পড়েছি ছেলেবেলায়। চমৎকার কবিতাটি লেখার পেছনেও মজার এক কাহিনী। ১৯২১ সালের দিকে কুমিল্লায় বেড়াতে গিয়েছিলেন কবি। উঠেছিলেন ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসায়। ইন্দ্রকুমার বাবুর ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে, নাম অঞ্জলি। এক নিস্তব্ধ দুপুরে নজরুল দেখতে পান, একটা পেয়ারা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে নানা অঙ্গভঙ্গী করে, হাত-পা নেড়ে অঞ্জলি কারো সঙ্গে কথা বলছে। নজরুল একটু খেয়াল করে শুনে বুঝলেন কেউ একজন পেয়ারা গাছে উঠেছে। তার কাছে অঞ্জলি কাকুতি-মিনতি করে পেয়ারা চাইছে কিন্তু পাচ্ছে না।
নজরুলের মায়া লাগলো, ভাবলেন অঞ্জলির হয়ে তিনিই পেয়ারা চাইবেন, তবু না দিলে নিজেই গাছে উঠে পেয়ারা পেড়ে দেবেন। ঘর থেকে বেরিয়ে অঞ্জলির কাছে গিয়ে নজরুল গাছের ওপর কাউকেই খুঁজে পেলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, “খুকী কার সাথে কথা বলছিলে?”
অঞ্জলির মিষ্টি রিনরিনে কন্ঠের অভিযোগ, “ওই দুষ্টু কাঠবেড়ালীটার সাথে। রোজ রোজ দুষ্টুটা পেয়ারা খেয়ে পালিয়ে যায়। আমাকে একটাও খেতে দেয় না।”
কাঠবেড়ালীর সঙ্গে অঞ্জলির এমন মান-অভিমানের দৃশ্যপট কবিকে এতোটাই মুগ্ধ করলো যে, সেই ঘটনা নিয়েই লিখে ফেললেন ‘খুকী ও কাঠবেড়ালী’ ছড়াখানা।
“কাঠবেড়ালী! কাঠবেড়ালী! পেয়ারা তুমি খাও?
গুড়-মুড়ি খাও! দুধ-ভাত খাও?বাতাবি লেবু? লাউ?
বেড়াল বাচ্চা? কুকুর ছানা? তাও?”
কবির হাস্যরসাত্মক সত্ত্বা
সারাজীবন ধরে কাজী নজরুল ইসলাম বলতেই আমরা শুধু শুনে এসেছি দুখু মিয়ার কষ্টের কথা, আর বিদ্রোহী কবি হিসেবে তার কবিতায়, গানে দখলদার শাসকদের ভীত করে দেয়ার গল্প। দুখু মিয়ার বড় হয়ে শিশুদের সাথে তার চমৎকার গল্পগুলো যেমন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, তেমনি বলা হয় না কি দারুণ হাস্যরসে পরিপূর্ণ একজন মানুষ ছিলেন নজরুল ইসলাম। কবির আশেপাশে থাকা মানুষজনের হাসতে হাসতে পেট ব্যথা করে ফেলা ছিল সেই সময়ের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

কাজী নজরুল আসাদউদ্দৌলা সিরাজীর নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন সিরাজগঞ্জে। খেতে বসেছেন আরো অনেক আমন্ত্রিত অতিথির সাথে। আসাদউদ্দৌলা সাহেব নিজেই ইলিশ ভাজা তুলে দিচ্ছেন সবার প্লেটে প্লেটে, কবিকে খাওয়াবেন বলে জেলেদের আগেই বলে রেখেছিলেন, যমুনার তরতাজা ইলিশের প্রচুর সমাহার খাদ্যতালিকায়। থালায় ইলিশ পড়া মাত্র নজরুল সেটা খেয়ে ফেললেন। তখনই কে যেন আরও কয়েক টুকরো ইলিশ দিতে যাচ্ছেন কবির পাতে। কবি চিৎকার করে উঠলেন হঠাৎ,
“আরে আরে করছ কী?” গৃহস্থ হকচকিয়ে গিয়েছেন ততক্ষণে, কবি ফের বললেন, “আমাকে এত ইলিশ দিও না। শেষকালে আমাকে বিড়াল কামড়াবে তো!”
ইলিশ ভাজার সাথে বিড়ালে কামড় খাওয়ার কী সম্পর্ক কেউ বুঝতে পারলেন না। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন কবির মুখের দিকে। কবিও রহস্য ধরে রেখে মিটিমিটি হাসছেন। শেষে অবশ্য আর হাসি মিটিমিটিতে দমিয়ে রাখতে পারলেন না, বিকট শব্দে হাসতে হাসতে বললেন,
“আরে বুঝলে না, ইলিশমাছের গন্ধ মানুষের মুখেই লালা ঝরায়। আর বিড়াল তো মাতাল হয়ে যায় এর ঘ্রাণে। বেশি খেলে কি আর রক্ষে আছে? সারা দেহ থেকে গন্ধ ছুটবে আর সে গন্ধ পেয়ে বিড়াল তেড়ে আসবে, মাতাল বিড়ালের কি আর সে খেয়াল থাকবে যে আমি মানুষ না ইলিশ মাছ?”
এমন ব্যাখ্যা শুনে রামগড়ুরের ছানাও কি না হেসে পারে? হাসির ফোয়ারা ছুটলো পুরো ঘরে।
খাবারের পর দই পরিবেশন হচ্ছে। কবির পাতেও দেওয়া হল। সিরাজগঞ্জের দই মিষ্টি দুটোই বেশ বিখ্যাত কিন্তু সেদিনের দই কেন যেন টক ছিল। খানিকটা দই মুখে দিয়েই কবি আসাদউদ্দৌলার মুখের দিকে তাকিয়ে খোঁচা মেরে বলতে ছাড়লেন না, “কী হে সিরাজী, তুমি এই দই তেঁতুল গাছ থেকে মাত্রই পেড়ে নিয়ে এলে বুঝি?”ফের হাসির জোয়ার উঠল খাবার আসরে।
এমন হাসিঠাট্টা করে আনন্দে রাখতেন কবি সবাইকে, এতে সমালোচনাও যে সহ্য করতে হয়নি কখনো কখনো, এমন নয়। একবার গোপীনাথ নামে এক ভদ্রলোক কোন এক কাজ নিয়ে ধূমকেতুর অফিসে এসে এমন কাণ্ড দেখে বেশ ক্ষেপে গিয়ে তিরস্কার করে বললেন, দেশ পরাধীন। সাহেবদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ দেশের সাধারণ মানুষ, ন্যুনতম মৌলিক অধিকার নেই জনগণের, এমন দুঃসহ পরিস্থিতিতে মনে এত আনন্দ উল্লাস আসে কোত্থেকে?
নবযুগে আনুক প্রানবন্যা
কিন্তু তিনি যে কবি নজরুল, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালীদের একজন। সকল কথার জবাব তার জিভের ডগায় এসে যেন ভর করে থাকে। ভরাট গলায় জবাব দিলেন,
” প্রতিটি ইংরেজ নয়, সমগ্র ইংরেজ সমাজ আমাদের শত্রু। এ শত্রুদের ভাসিয়ে দিতে হলে চাই প্রাণবন্যা। এরই চাষাবাদ করছি আমরা এখানে।”

আসলেই তাই, দুঃখকষ্টের বন্দনায় দুঃখ দূর হয় না, বরং দীর্ঘদিন মনমরা থেকে দুঃখ চর্চায় প্রাণ মরে যায়, মৃত প্রাণে কি আর মুক্তি আসে কখনো?
চারপাশের এত এত খারাপ খবরের এই দুঃসময়েও, সারাদিনের মধ্যে অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও সব ভুলে আনন্দে থাকা এবং আনন্দে রাখা খুব জরুরী। দেহবিনাশের দুশ্চিন্তায় দেহের আগেই যেন প্রাণ মরে না যায়। যে জীবনের পদে পদে ছিলো রোমাঞ্চকর সব ঘটনা, জয় পরাজয়ের উপাখ্যান, সে জীবনকে পাঠ্যবইতে যতইটাই একঘেয়েমি করে তোলা হোক না কেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম থাকবেন সর্বদাই সমুজ্জল। তারুণ্যের কবি কাজী নজরুল ইসলামের একশত বাইশতম জন্মজয়ন্তীতে এই হোক কামনা, নব আনন্দে জাগুক তরুণ প্রাণ।
References:
Feature Image: Bangla News24
