তরুণদের কাছে রক সংগীত মানেই জীবনের আরেক নাম ৷ কিন্তু এই রক মিউজিকেই একটা বিখ্যাত ক্লাব আছে যেখানে মারা না গেলে অন্তর্ভুক্ত হওয়া যায় না। আরো সোজা বাংলায় বললে, শুধুমাত্র সাতাশ বছর বয়সে মারা গেলেই এই ক্লাবের সদস্য হওয়া যায়! কি চমকে উঠলেন? রক লাভার মাত্রই ‘দ্য টুয়েন্টি সেভেন ক্লাব’ এর কথা জানেন ৷ যারা জানেন না, তাদেরকে এ সমন্ধে জানাতে এক কথায় বলা যায় — ঠিক সাতাশ বছর বয়সেই অস্বাভাবিক ভাবে মৃত্যুবরণ করা রক তারকাদেরকে একসাথে ‘দ্য টুয়েন্টি সেভেন ক্লাব’ এর অন্তর্ভুক্ত করা হয় ৷ জিমি হেন্ড্রিক্স, জেনিস জপলিন, জিম মরিসন, ব্রায়ান জোনস, কার্ট কোবেইন থেকে শুরু করে পৃথিবীর অনেক রক কিংবদন্তীই এই ‘টুয়েন্টি সেভেন ক্লাব’ এর সদস্য ৷
৩ রা জুলাই, ১৯৬৯ ৷ সুইমিং পুলে জনপ্রিয় ইংলিশ ব্যান্ড দ্য রোলিং স্টোনস এর গীটারিস্ট ব্রায়ান জোনসের লাশ পাওয়া যায় ৷ তার ঠিক দুই বছর পর, একই তারিখে প্যারিসে কিংবদন্তী সংগীত শিল্পী জিম মরিসনের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে ৷ আশ্চর্যের ব্যাপার হলো মৃত্যুকালে দুজনের বয়সই ছিল সাতাশের ঘরে ৷ ধারনা করা হয় সেখান থেকেই ‘টুয়েন্টি সেভেন ক্লাব’ এর ধারনাটি সংগীত প্রিয় শ্রোতাদের মনে রহস্যের ডালপালা মেলতে শুরু করে ৷

তবে এই ঘটনাগুলো ১৯৯৪ সালের আগ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিলো ৷ কিন্তু ১৯৯৪ সালে সফল ও শ্রোতাপ্রিয় রক ব্যান্ড নির্ভানার সিংগার, সংরাইটার সাতাশ বছর বয়সী কার্ট কোবেইনকে যখন তার ঘরে মৃত অবস্থায় আবিষ্কার করা হয় — তখন পুরো বিশ্ববাসী যেন একসাথে নড়েচড়ে উঠে ৷ যোগসূত্র খুঁজতে গিয়ে হতচকিত হয় ৷ আবিষ্কার করে পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত এবং প্রতিশ্রুতিশীল সংগীত শিল্পীই কাকতালীয়ভাবে ঠিক সাতাশ বছর বয়সেই আত্মঘাতী হয়েছেন ৷ ঠিক সাতাশ বছরেই কেন সে নিয়ে আজও বহু তর্ক বিতর্ক এবং মতবাদ, পাল্টা মতবাদ জারি আছে সারাবিশ্বের নানা সংগীতপাগল মানুষের মনে ৷

রবার্ট জনসনকে দ্য টুয়েন্টি সেভেন ক্লাবের প্রাথমিক সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয় ৷ কিংবদন্তী ডেল্টা ব্লুজ শিল্পী রবার্ট জনসনকে অনেকেই না চিনতে পারেন ৷ কিন্তু যারা রক সংগীতের ভক্ত তারা এরিক ক্ল্যাপটনের বাজনায় রবার্ট জনসনেরই ‘ক্রসরোডস’ গানটা জীবনে একবার হলেও শুনেছেন ৷ ক্ল্যাপটনসহ তৎকালীন অনেক গীটার মায়েস্ত্রোর কনফেশনেই রবার্ট জনসন ছিলেন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্লুজ সংগীতের কারিগর ৷ ক্রসরোডস গানটিতে একজন ব্লুজ গায়কের উপমায় জনসন যেন নিজের কথাই বলতে চেয়েছেন যে কিনা জনপ্রিয়তার বদলে শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রি করে দিয়েছিল ক্রসরোডে এসে ৷ নিজের সাতাশতম জন্মদিনের কিছুমাস পর ১৯৩৮ সালে রবার্ট জনসনের মৃত্যুটা যেন আচমকাই ঘটেছিলো ৷ মৃত্যুর কারন হিসেবে মদের বিষক্রিয়া এবং নিউমোনিয়াকে দায়ী করা হলেও ডেথ সার্টিফিকেটে জনসনের মৃত্যুর কারন হিসেবে সিফিলিসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ আছে ৷ তড়িঘড়ি করে এক অখ্যাত স্থানে রবার্ট জনসনকে কবর দেয়া হয়েছিলো ৷ আজ এত দিন পর কিসের এত তাড়াহুড়া ছিলো সে কথা অবশ্য কেউই ঠিক করে বলতে পারেন না ৷

টুয়েন্টি সেভেন ক্লাবের আরেক সদস্য ‘দ্য রোলিং স্টোনস’ ব্যান্ডের ফাউন্ডার মেম্বার ব্রায়ান জোনস ৷ মৃত্যুর আগেই তীব্র মাদকাসক্তি জোনসকে অন্তিম এক হতাশার দিকে ধাবিত করেছিলো ৷ জোনস রোলিং স্টোনস ছেড়ে চলে যাবার পর তার এই আসক্তির মাত্রা আরো চরমে পৌঁছে এবং একদিন এক সুইমিংপুলে জোনসকে মৃত অবস্থায় ভাসতে দেখা যায় ৷ ময়নাতদন্তের পর জানা যায় অতিরিক্ত মাদকের প্রভাবে হঠাৎ দমবন্ধ হয়ে জোনসের মৃত্যু ঘটেছিলো ৷ তবে পরবর্তীতে দেনা পাওনার অর্থ সংক্রান্ত বিষয়ে একজন কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার দ্বারা জোনসের খুন হবার সম্ভাবনার কথাও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায়না ৷
গীটার লিজেন্ড জিমি হেন্ড্রিক্সের মৃত্যু নিয়েও কম জলঘোলা হয়নি ৷ শোনা যায় মৃত্যুর কয়েকদিন আগে থেকেই হেন্ড্রিক্স ঘুমজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন ৷ এর কারন হিসেবে অবশ্য তার বেজিস্ট বিলি কক্সের লাইনআপ ছেড়ে যাওয়া, নিজের অগোছালো জীবনযাপন সংক্রান্ত অব্যবস্থাপনার কথাই উঠে আসে ৷ মারা যাওয়ার আগের দিন একটা পার্টিতে বান্ধবী সমেত হাজির হয়েছিলেন এই গীটার গড ৷ সেখানেও থাকেন নি বেশিক্ষণ ৷ বান্ধবীর চাপাচাপিতে পার্টি ছেড়ে বাসায় চলে এসেছিলেন, সেই বাসাতেই পরদিন জিমির আকষ্মিক মৃত্যু হয় ৷

জিমির এম্ফিটামিন নামের একধরনের উত্তেজক ক্যামিকেল ব্যবহারের বাতিক ছিলো ৷ পার্টিতে যাওয়ার আগে এম্ফিটামিন সেবনের কারনে, পার্টি থেকে ফিরে গতানুগতিক নিয়মেই তিনি ঘুমজনিত অসুবিধা অনুভব করতে থাকেন ৷ সকালের দিকে বান্ধবী ডেনিম্যান জিমিকে ঘুমন্ত অবস্থায় পান, এবং সিগারেট কিনতে ঘর থেকে বের হন ৷ কিন্তু বাসায় ফিরে তিনি আবিষ্কার করেন জিমি অচেতন হয়ে আছে ৷ যদিও তখনও তার শ্বাস প্রশ্বাস চলছিলো ৷ ডেনিম্যান জিমির এই অবস্থা দেখামাত্রই অ্যামবুলেন্স কল করেন এবং ধারনা করা যায় ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিলো ৷
ক্রমাগত বমি করছিলেন হেনড্রিক্স ৷ খাদ্যনালীর বমি শ্বাসনালিতে আটকে গিয়ে মাত্র সাতাশ বছর বয়সেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই গীটার জিনিয়াস ৷ ময়নাতদন্তের পর তার শরীরে পাওয়া এম্ফিটামিন, ক্যানাবিস এবং এলকোহলকে এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়েছিলো ৷ তার রক্তে ভ্যাসপারেক্স নামক একধরনের নিদ্রা উদ্রেককারী ঔষধেরও উপস্থিতি নির্ণয় করেছিলেন চিকিৎসকেরা ৷ এই ঘুমের ঔষধের বিষক্রিয়ায়, এসফিক্সিয়া নামক একধরনের শারীরিক বৈকল্যের কারনেও জিমির মৃত্যু ঘটতে পারে বলে চিকিৎসকেরা অনুমান করেছিলেন ৷
কাকতালীয় হলেও সত্যি জিমি হেন্ড্রিক্স মারা যাওয়ার ঠিক পরের মাসেই সাতাশ বছর বয়সে অস্বাভাবিক মৃত্যু বেছে নিয়েছিলেন আরেক কিংবদন্তী সংগীত শিল্পী জেনিস জপলিন ৷ জপলিনের মৃত্যুর পরেও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ইতিউতি অনেক রহস্যের ডালপালা মেলার খবর শ্রোতাদের আলোচনায় উঠে এসেছে ৷

আমেরিকান সিঙ্গার, সংরাইটার জেনিস জপলিনের কৈশোরের দিনগুলো মোটেও ভালো যায়নি ৷ স্থূলতার কারনে হাইস্কুলে সহপাঠীদের দ্বারা জপলিন এত পরিমাণে বুলিংয়ের স্বীকার হয়েছিলেন যা তার পরবর্তী জীবনে দারুন প্রভাব ফেলেছিলো ৷ অনেকের সংস্পর্শে কাজ করেছেন ৷ বিভিন্ন ব্যান্ডের সাথেই গেয়েছেন তিনি, বের করেছেন নিজের সলো অ্যালবাম ৷ তবু বিষন্নতা তাকে পদে পদে তাড়িয়ে বেরিয়েছে ৷ জীবনের শেষদিকে প্রেমিকের সাথে বিচ্ছেদের ঘটনা বিষন্ন জপলিনকে ধীরে ধীরে মাদকের প্রতি অতি আগ্রহী করে তুলেছিলো বলে তার বন্ধুদের মুখে শোনা যায় ৷
জেনিস তখন তার দ্বিতীয় সলো অ্যালবাম ‘পার্ল’ রেকর্ডিং এর কাজে ব্যস্ত ছিলেন ৷ সেদিন অক্টোবরের ৪ তারিখ, আগে থেকেই ‘সানসেট সাউন্ড স্টুডিও’ রেকর্ডিং এর জন্য বুকিং দিয়ে রেখেছিলেন জেনিস জপলিন ৷ স্টুডিওর কাছাকাছি একটা হোটেলে থাকতেন একা একা ৷ ঐদিন তার স্টুডিওতে আসতে দেরি হওয়ায় তার প্রডিউসার পল রথচাইল্ড তার বন্ধু জন কুককে ফোন করেন জপলিনের খোঁজ নেয়ার জন্য ৷ জন কুকই সর্বপ্রথম বিছানার পাশে ফ্লোরে পড়ে থাকা জেনিস জপলিনের নিষ্প্রাণ দেহটা আবিষ্কার করেছিলেন ৷
অদ্ভুত বিষয় হলো ময়নাতদন্তে জেনিস জপলিনের মৃত্যুর কারন হিসেবে হেরোইন ওভারডোজের কথা উল্লেখ থাকলেও ঐদিন তার হোটেলে হেরোইনজাতীয় কোন মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি ৷ কেউ কেউ মনে করেন জেনিসেরই অজ্ঞাত কোন বন্ধু হয়তো পুলিশ আসার আগেই মাদক সরিয়ে দিয়েছিলেন তার রুম থেকে ৷ কিন্তু ময়নাতদন্তের আগ দিয়ে রহস্যজনক ভাবে আবার তার হোটেল রুম থেকে মাদক ব্যবহারের সরঞ্জামাদি পাওয়া যায় ৷ তবে জপলিনের প্রকাশক মিরা ফ্রিডম্যানের দেয়া এক তথ্য অনুসারে জানা যায় ঐদিন জপলিনের সাথে এক হোটেলবয়ের কথা হয়েছিলো ৷ জপলিন তাকে সিগারেট এনে দিতে অনুরোধ করেছিলেন ৷

জিমি হেন্ড্রিক্স এবং জেনিস জপলিনের মৃত্যুর নয় মাস পর দ্য ডোরস এর ফ্রন্টম্যান কিংবদন্তী সংগীত শিল্পী জিম মরিসনের লাশ পাওয়া যায় প্যারিসে, তার নিজস্ব বাথটাবে ৷ হেন্ড্রিক্স এবং জপলিনের মতো জিম মরিসনের মৃত্যু নিয়েও বিতর্ক আর রহস্য সৃষ্টি হয় মরিসনের বয়স বিবেচনায় ৷ অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, মৃত্যুকালে জিম মরিসনের বয়সও ছিলো ঐ সাতাশের ঘরেই ৷
‘দ্য ডোরস’ এর বিখ্যাত অ্যালবাম ‘এলএ উইমেন’ রেকর্ড পরবর্তী সময়ে মরিসন হঠাৎই অনুভব করতে শুরু করেন এই বৈষয়িক প্রতিপত্তি, নাম যশ তাকে ক্রমাগত ক্লান্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে ৷ সেখান থেকেই মরিসন একটা সিদ্ধান্তে আসেন ৷ নিজেকে যশ, সম্মান এবং রেকর্ড কোম্পানির চাপ থেকে আড়াল করে একটা নতুন জীবন শুরু করার তাগিদে তিনি দীর্ঘ দিনের প্রেমিকা পামেলা কারসন সহ প্যারিসে পাড়ি জমান ৷
আরও পড়ুনঃ নিনজা – আসলেই কি এরা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ভাড়াটে খুনী?
প্যারিসে পৌঁছে হয়তো একপ্রকার স্বস্তির জীবনই পেয়েছিলেন মরিসন ৷ কয়েক সপ্তাহের ভেতরে স্হূল, চুল দাড়িতে ঢাকা এই রকস্টারের স্বাস্থ্যগত উন্নতিই ছিলো তার বড় প্রমান ৷ কিন্তু, মাদকের ভূত তখনো পুরোপুরি তার মাথা থেকে বের হয়নি ৷ প্যারিসে তার পরিচিতদের বরাত দিয়েই জানা যায় তখনো মাদকের প্রতি একটা উৎসাহী আসক্তি ছিলো মরিসনের ৷
৩রা জুলাই, ১৯৭১ ৷ প্রেমিকা পামেলা কারসনই মরিসনকে পানি ভর্তি বাথটাবে মৃত অবস্থায় আবিষ্কার করেন ৷ ফরাসি আইন অনুযায়ী পোস্টমর্টেম না হওয়ার কারনে জিম মরিসনের মৃত্যু নিয়ে আজও নানা প্রশ্ন তৈরি হয় ৷ মরিসনের নিকটবন্ধুরা মৃত্যুর কারন হিসেবে হেরোইন ওভারডোজের কথা বললেও কেউ কেউ বিশ্বাস করতে চান হার্ট ফেইলিউরের কারনেই জিম মরিসনের মৃত্যু হয়েছে ৷ মৃত্যুর এতদিন পর আজ যেহেতু সত্য জানবার অবকাশ নেই, তাই আজও জিম মরিসনের মৃত্যু পৃথিবীর সংগীত ইতিহাসে এক আনসলভড মিস্ট্রি ৷

কেউ কেউ কার্ট কোবেইনের মৃত্যুকে ভিঞ্চি কোডের চেয়ে রহস্যময় বলে মনে করেন ৷ এই ধারনা যে আসলেই সত্যি তা আপনি আপনার কোন বন্ধুকে কোবেইনের মৃত্যু সমন্ধে জিজ্ঞেস করলেই বুঝতে পারবেন ৷ কেউ কেউ বলবে কার্ট কোবেইন আত্মহত্যা করেছেন, আবার কারো কারো কাছ থেকে আপনি জানতে পারবেন মূলত খুন করা হয়েছিলো কোবেইনকে ৷ কিন্তু কোবেইনের সাথে আসলে হয়েছিলটা কি?
৮ ই এপ্রিল, ১৯৯৪ ৷ সিয়াটলের বৈদ্যুতিক কর্মী গ্যারি স্মিথের ঐদিন শিডিউলড ডিউটি ছিলো কোবেইনের বাড়িতে ৷ বাড়ির সামনের বাতি মেরামত করতে গিয়ে স্মিথই সর্বপ্রথম জানলা দিয়ে কোবেইনকে ফ্লোরে পড়ে থাকতে দেখেন ৷ নিথর কোবেইনের কানের পাশটা রক্তাক্ত দেখে, দ্রুত পুলিশকে খবর দেন ঐ বৈদ্যুতিক কর্মী ৷ পুলিশ ঘটনাস্থলে দ্রুত হাজির হয়ে কোবেইনের লাশের পাশে একটা শটগান দেখে নিশ্চিত হয় আত্মহত্যাই করেছেন এই রকস্টার ৷ তবে ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট জানায় লাশ পাবার তিনদিন আগেই কোবেইনের মৃত্যু হয়েছিলো ৷ আর তার হাঁটুতে জখমের দাগ, কোবেইনের সুইসাইড নোট পরবর্তীতে কোবেইনের মৃত্যু সংক্রান্ত নানা কন্সপিরেসি থিউরির জন্ম দেয় ৷

কোবেইনের সুইসাইড নোট পড়লে দেখা যায় নিজের একাকীত্ব, পেশাগত ক্লান্তি, স্ত্রীর সাথে বনিবনা সংক্রান্ত ঝামেলায় কতটা জর্জরিত ছিলেন এই রকস্টার ৷ স্ত্রীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় ডিভোর্স নিতে চাইছিলেন, স্ত্রীকে বাদ দিতে চেয়েছিলেন নিজের উইল থেকে ৷ হয়তো সে কারনেই তিনি খুন হতে পারেন বলে সংগীত মহলে গুঞ্জন আছে ৷
ব্রিটিশ সিঙ্গার, সংরাইটার অ্যামি ওয়াইনহাউজের মৃত্যুর ঘটনা ক্লাব টুয়েন্টি সেভেন সম্পর্কিত সর্বশেষ আলোচিত খবর ৷ গ্র্যামিজয়ী এই মেধাবী শিল্পী ২০১১ সালের ২৩শে জুলাই অ্যালকোহল পয়জনিংএ মৃত্যুবরণ করেন ৷

মাদকাসক্তিই অ্যামির জীবনে কাল হয়ে নেমে এসেছিলো ৷ মৃত্যুর আগে শেষ কনসার্টগুলোতে মাতাল অবস্থায় পারফর্ম করতে গিয়ে প্রায়শই তালগোল পাকিয়ে ফেলতেন ৷ এজন্য দর্শকদের দুয়োও কম শোনেননি ৷ এমনকি জীবনের শেষ কনসার্টটিতেও দর্শকদের গালিগালাজ, ঠাট্টাতামাশার জন্য শো ক্যান্সেল করতে হয়েছিলো সাতাশ বছর বয়সী গুণী এই নারী শিল্পীকে ৷
এই ঘটনার পর পরই খুবই দমে গিয়েছিলেন অ্যামি ৷ তার বডিগার্ডের ভাষ্যমতে টানা তিনদিন নিজস্ব ফ্ল্যাট থেকে একবারের জন্যও বের হননি তিনি ৷ অন্যদিকে ক্রমাগত মদ্যপানের সাথে সাথে করছিলেন অস্বাভাবিক অপ্রকৃতস্থ আচরণ ৷ সকালে অ্যালার্মের শব্দেও যখন ঘুম থেকে জাগলেন না, দুপুরের পর সেই বডিগার্ড এসে বিছানায় অ্যামিকে নিথর অবস্থায় আবিষ্কার করে ৷ পরে ময়নাতদন্তে অ্যামির মৃত্যুর কারন হিসেবে অ্যালকোহল পয়জনিংয়ের কথা উল্লেখ করা হয় ৷
ওয়ার্কলোড, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, বিষন্নতা, সম্পর্কের টানাপোড়নকে ছাপিয়ে প্রতিটি মৃত্যুর কারন হিসেবে মাদকের প্রভাবকে বড় করে দেখতে চাইলে দেখা যেতে পারে ৷ কিন্তু প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায়, মৃত মানুষটির বয়স বিবেচনা আলাদা করে কিছু প্রশ্ন, রহস্যের সম্ভাবনা জন্ম দেয় ৷ বিখ্যাত ম্যাগাজিন দ্য রোলিং স্টোনসের তথ্যমতে এখন পর্যন্ত ঠিক সাতাশ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া সংগীতশিল্পীর সংখ্যা কমপক্ষে সত্তরেরও ওপরে ৷ ঠিকই ধরেছেন, একটু চমকে উঠার মতই পরিসংখ্যান ৷

বাংলাদেশে সাতাশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছে এমন সঙ্গীতশিল্পি মাইলস ব্যান্ড এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হ্যাপি আখন্দ! ১৯৬০ সালে জন্ম এই ক্ষণজন্মা পপ গায়ক ১৯৮৭ সালেই হুট করে মারা যান। তবে মৃত্যুর আগে তিনি “আবার এলো যে সন্ধ্যা” বা “কে বাঁশী বাজায় রে”এর মতো জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে যান বাংলাদেশী শ্রোতাদেরকে। প্রয়াত ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চু একটা কথা প্রায়ই বলতেন। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতে প্রথম ধাক্কা ছিল হ্যাপীর চলে যাওয়া, মাত্র সাতাশ বছর বয়সেই হ্যাপী চলে যাওয়ায় অনেক বড় ক্ষতি ছিল এদেশের পপ সংগীতাঙ্গনের। দলছুটখ্যাত সঞ্জীব চৌধুরীর ‘বয়স হলো ২৭’ নামের একটি গান আছে, সেটা যেন সাতাশ বছর বয়সের স্ট্রাগলকেই আমাদের সামনে নিয়ে আসে ৷ ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল (বিএমজেড) জানিয়েছে বিশ থেকে ত্রিশের ঘরে যেতে যেতে মৃত্যুবরণ করা সংগীত শিল্পীদের মৃত্যুহার অন্য যেকোন বয়সে মারা যাওয়া শিল্পীদের মৃত্যুহারের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি ৷
পশ্চিমের রাজনীতিতে ক্লাব টুয়েন্টি সেভেন ঘিরে সিক্রেট ইন্টিলিজেন্স মিশনের সম্পৃক্ততার কথাও শোনা যায় ৷ মৃত বেশ কয়েকজনের একই রঙের সাদা লাইটার ব্যবহারের মুখরোচক গপ্পো উঠে তরুনদের জমজমাট আড্ডার মধ্যিখানে ৷ কেউ কেউ তো বলেই বসেন কার্ট কোবেইন টুয়েন্টি সেভেন ক্লাবে যোগ দিতেই সুইসাইড করেছিলেন, আর কোন কাহিনী নেই ৷
ঠিত এতসব গুঞ্জনের ভিড়ে সত্যকে এখানে ঠিকঠাক খুঁজে পাওয়া যায় না বলে আজও ক্লাব টুয়েন্টি সেভেন মানুষের কাছে এক আশ্চর্যের নাম, বিষ্ময়ের বিষয়বস্তু ৷ একটা নির্দিষ্ট বয়সে একটা পেশারই এতজন মানুষের ভাগ্যে একই ঘটনা — এটা কি আসলেই কাকতালীয় নাকি এর পেছনে অন্য কোন ষড়যন্ত্রের গল্প আছে?
References:
- The 27 Club: A Brief History
- 27 Little-Known Facts About The 27 Club | Thought Catalog
- The 27 Club: The Legendary Musicians Who died at 27
Feature Image: Wikipedia
