পপ কালচারের সাথে পরিচিত হলে বা অ্যানিমে ফ্যান হয়ে থাকলে নিনজা শব্দটা কারো অপরিচিত নয়। অতিমানবীয় ক্ষমতার অধিকারী গুপ্তঘাতক ও যোদ্ধাদের একটা দল, অদম্য, দুর্ধর্ষ, নির্ভীক, যাদের অদৃশ্য হবার, পানির ওপর দিয়ে ছুটে যাবার বা রূপ বদলানোর ক্ষমতা আছে। অসংখ্য সিনেমা সিরিজ আর অ্যানিমে তৈরি হয়েছে এই নিনজাদের নিয়ে। তৈরি হয়েছে অসংখ্য গল্প, কিংবদন্তী, মিথ। তাদের নিয়ে হয়েছে বিভিন্ন ধরণের গবেষণা।
নিনজারাই হয়ত পৃথিবীর সামরিক সংগঠনগুলোর মধ্যে একমাত্র, যাদের ঝুলিতে এত মিথ আর গল্পগুজব রয়েছে। তবে, তার কতটুকু সত্য?
প্রথমেই আসি ‘নিনজা’ নামকরণটি নিয়ে। নিনজাদের ইতিহাস প্রায় ৮০০ বছরের পুরনো হলেও, তাদের নিনজা নামে উনবিংশ শতাব্দীর আগে কখনও অভিহিত করা হয়নি। তাদেরকে প্রকৃতপক্ষে ‘শিনোবি নো মোনো’ বা ‘শিনোবি’ বলা হত। শিনোবি শব্দটা পাওয়া যায় অষ্টম শতকে রচিত হাইকুতে। এর অর্থ ছিল চুরি করা বা লুকিয়ে থাকা।

চীনা সমরবিদ ও দার্শনিক জিয়ান জিয়া তার সামরিক কৌশল বিষয়ক বই, “সিক্স সিক্রেট টিচিং” এ সর্বপ্রথম বিশেষায়িত সামরিক বিভাগ সমূহের কথা উল্লেখ করেন যেখানে গুপ্তচরবৃত্তি ও গুপ্তঘাতক দলের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা ছিল।
প্রথমত সামন্ত জাপানের উচ্চবংশীয় সামরিক ব্যক্তিবর্গ যাদের সামুরাই বলা হত, তারা ছিলেন শোগুনের প্রতি অনুগত। জাপানে সামরিক স্বৈরশাসকগণকে “শোগুন” বলা হত। শোগুনরা এই ধরণের গোপন যুদ্ধের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে ছিলেন। এই ধরণের যুদ্ধকৌশল একটা সময়ে জাপানে মৃত্যুদন্ডযোগ্য অপরাধ ছিল। তবে সময়ের সাথে জাপানের শাসকরা এর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে শুরু করেন। তারা গুপ্তচর বা ঘাতক হিসেবে নিনজাদের তখন থেকেই নিয়োগ দেওয়া শুরু করেন।
প্রথম শিনোবি নামটা যুক্ত হয় চতুর্থ শতকের ইয়ামাটো রাজবংশের রাজপুত্র ওনসুর নামের সঙ্গে। কথিত আছে, তিনি ইয়ামাটো রাজবংশের প্রতিপক্ষ কুমাসোদের নেতৃস্থানীয়দের হত্যা করেন। তাদের এক মদ্যপানের আসরে তিনি একজন পরিচারিকার ছদ্মবেশে প্রবেশ করেন ও মাতাল কুমাসো নেতাদের ওপর ছুরি হাতে ঝাপিয়ে পড়েন। তার হাতে নিহত কুমাসো নেতাদের একজন মৃত্যুর আগে তাকে ইয়ামাটো টাকেরু বা ইয়ামাটোদের বীর নামকরণ করেন। তবে এই নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। তৎকালীন জাপানের সামরিক আইন এই ধরণের কর্মকান্ডকে খুব নিচু চোখে দেখত আর শক্তভাবে বিরোধিতা করত।

চোরাগোপ্তা হামলা, গুপ্তহত্যা এসবকে অসম্মানিত বলে জ্ঞান করা হত। কোন সামুরাই যদি ইচ্ছে করে এই ধরণের কর্মকান্ডে লিপ্ত হয় তাহলে তার শাস্তি ছিল মৃত্যুদন্ড। হয় সে হারাকিরি করে সম্মান জিইয়ে রেখে মৃত্যুকে বরণ করে নেবে, নইলে ভয়ংকর অপমানের সঙ্গে শোগুন তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করবে। এমন পরিস্থিতিতে তার হাতে চোরাগোপ্তা হামলায় নিহত ব্যাক্তির তাকে মৃত্যুর আগে ইয়ামাটোদের বীর আখ্যা দেওয়াটা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে ওনসুকে তারপর থেকে ইয়ামাটো টাকেরু নামেই গোটা জাপান চেনে। তার আবক্ষ মুর্তিও ছিল তদানীন্তন কোনসু রাজ্যে।
এরপর নিনজাদের উল্লেখ পাওয়া যায় ষষ্ঠ শতকে, রাজপুত্র শোটোকু সাফল্যের সাথে শত্রুর বিরুদ্ধে গুপ্তচরদের কাজে লাগান। এটাই গুপ্তচরবৃত্তির ওপর পৃথিবীতে পাওয়া প্রথম প্রামাণ্য দলিল। দশম শতকে শোমোনকি গ্রন্থে কোহারুমারু নামের এক বালকের উল্লেখ পাওয়া যায়। গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধে তার শিরশ্ছেদ করা হয়।
আরও পড়ুনঃ ডার্ক ওয়েবে আসলেই কি রেড রুম আছে?
এছাড়াও পরে চতুর্দশ শতকের যুদ্ধকালীন দলিলপত্রে শিনোবি কথাটার উল্লেখ পাওয়া যায় যা থেকে বোঝা যায় যুদ্ধে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে তখন নিনজা বা শিনোবিদের কাজে লাগানো হত।
কিন্তু সামুরাইদের সাথে নিনজাদের সম্পর্ক কোন কালেই ভাল ছিল না। নিনজারা কাজ করত টাকার বিনিময়ে আর এর বিরুদ্ধে ছিল সামুরাইদের অবস্থান। নিনজারা ছিল মূলত শোগুনের বিরোধী। কিন্তু এই শত্রুতার পরেও সামুরাই, সামন্ত বা শোগুনদের নিনজা ভাড়া করা বন্ধ হয়নি। তারা শত্রুকে সহজ পথে নিকেশ না করতে পারলে নিনজাদের দ্বারস্থ হত।
খ্রীস্টপূর্ব ৬০০ শতকে সান জু তার আর্ট অফ ওয়ার গ্রন্থে গুপ্তচর ও গুপ্তঘাতকদের বিষয়ে বর্ণনা করলেও পঞ্চদশ শতাব্দীর আগে কখনও প্রশিক্ষিত গুপ্তচরদের কথা জানা যায়নি। জাপানীরা আর্ট অফ ওয়ারের বিভিন্ন দীক্ষা গ্রহণ করলেও গুপ্তহত্যা ও গুপ্তচরবৃত্তির অধ্যায়টা তারা একরকম এড়িয়ে যায়।
প্রশিক্ষিত আর সংঘবদ্ধ নিনজাদের উত্থান হয় পঞ্চদশ শতকে, সেনগোকু আমলে, ইগা প্রদেশের কোগা নামক গ্রামে। ইগা প্রদেশটি ছিল পর্বতে ঘেরা ও দুর্গম, এ কারণেই ওই অঞ্চলটি গোপনে গুপ্তঘাতকদের প্রশিক্ষণ দেবার জন্য আদর্শ ছিল। ইতোপূর্বে নিনজারা কখনো সংঘবদ্ধভাবে কাজ করেনি। টাকার লোভ দেখিয়ে শাসকগোষ্ঠী সমাজের দরিদ্রদের দিয়ে কাজ করাতেন। কোগা গ্রামে সর্বপ্রথম নিনজাদের প্রশিক্ষণকেন্দ্র আর প্রথম বাহিনী তৈরি হয়। সামন্ত জাপানের সামুরাই অধ্যুষিত অঞ্চলে নিনজাদের প্রয়োজনীয়তার কারণ বিভিন্ন গবেষক বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

তার মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ধরা হয় যে ব্যাখ্যাটি সেটি হল, ‘তৎকালীন জাপানে সামন্ত রাজাদের মধ্য থেকে বিভিন্ন ওয়ার লর্ডের উত্থান হয়। যুদ্ধে জেতার জন্য তাদেরকে বিভিন্ন বাঁকা পথের আশ্রয় নিতে হয়। যেমন গুপ্তচরবৃত্তি, গুপ্তহত্যা, গেরিলা হামলা, অন্তর্ঘাত, অগ্নিসংযোগ। আগেই বলা হয়েছে এসব কর্মকান্ড তৎকালীন জাপানে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ওয়ার লর্ডদের সাথে যে সকল উচ্চবংশীয় সেনাপতিরা ছিলেন তারা সকলেই ছিলেন সামুরাই। তারা শোগুনের নিয়মে বাঁধা এবং নিজের সম্মান রক্ষার্থে এই ধরণের কর্মকান্ডে লিপ্ত হতেন না। আর একটি কারণ ছিল অধীনস্ত সৈন্যের স্বল্পতা। ওয়ারলর্ডদের সকলের যথেষ্ট পরিমাণ সৈন্য সংগ্রহের ক্ষমতা থাকত না। তারা অর্থের বিনিময়ে তার পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য সৈন্য ভাড়া করতে পারতেন। সৈন্য যত প্রশিক্ষিত আর দুর্ধর্ষ তার পারিশ্রমিক তত বেশি। এই কারণেই পনের শতক থেকে নিনজারা ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। নিনজারা বেশিরভাগই ছিল গ্রামের কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ। নিম্নবর্ণের লোকেদের সম্মানের ভয় নেই, কাজেই তাদের প্রশিক্ষিত করা শুরু হল।
কোগার নিনজারা ১৪৮৫ সাল থেকে ১৫৮১ সাল পর্যন্ত ভাড়ায় বিভিন্ন জাপানী শাসকের জন্য কাজ করতে থাকে। পরে ওদা নোবুনাগা নামের একজন ওয়ার লর্ড ইগা প্রদেশে হামলা চালান ও নিনজাদের বসতি ধ্বংস করেন। নিনজারা টিকতে না পেরে পালিয়ে যায়। তাদের কিছু পালায় কাই পর্বতে, অধিকাংশই গিয়ে সম্রাট টোকুগাওয়া ইয়েয়াসুর কাছে আশ্রয় নেয়। টোকুগাওয়া ইয়েয়াসু ছিলেন তৎকালীন টোকুগাওয়া সাম্রাজ্যের সম্রাট। তিনি নিনজাদের নিজের অধীনে নিয়োগ দেন। ইগা গোত্রের বিখ্যাত নিনজা হাতোরি হানজো সম্রাটের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী নিযুক্ত হয়।

নিনজাদের প্রশিক্ষণ নিয়ে মিথ সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। নিঃশব্দে চলাচল করা, লাফিয়ে উঁচু উঁচু ভবনের ছাদে উঠে যাওয়া, আকাশে ওড়া, অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, রূপ বদলানো, একাই দশ বারোজনের সাথে যুদ্ধ করা ইত্যাদি বিষয়ে কিভাবে নিনজাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত? প্রশ্ন জাগে মনে।
পৃথিবীর সর্বশেষ নিনজা, কাওয়াকামি জিনিচি একটি সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, “নিনজাদের প্রশিক্ষণ ছিল মূলত বেঁচে থাকার, টিকে থাকার প্রশিক্ষণ। নিনজাদের লড়তে শিখতে হত কারণ, সবসময় গা বাচিয়ে চলা সম্ভব ছিল না। কখনও না কখনও শত্রুর সামনে পড়তেই হত। নিনজাদের প্রশিক্ষণ সাধারণ সামরিক প্রশিক্ষণের থেকে খুব একটা আলাদা কিছু ছিল না। কিছু ব্যাতিক্রম ছিল যেগুলো কেবল বিশেষায়িত অস্ত্রের ব্যবহারের ক্ষেত্রে ছিল।
কিন্তু কেমন ছিল নিনজাদের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি? আর ঠিক কিভাবে তারা হয়ে উঠলো ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর সৈন্যদের মধ্যে অন্যতম? সেটা জানতে আমাদের সাথেই থাকুন।
This Bangla Article is about the untold story of Ninja, usually, people call them the most horrible hired killers in history.
References:
- https://en.wikipedia.org/wiki/Ninja
- https://en.wikipedia.org/wiki/Yamato_Takeru
- https://en.wikipedia.org/wiki/The_Art_of_War
- Turnbull, Stephen (2003), Ninja AD 1460–1650, Osprey Publishing, ISBN 978-1-84176-525-9
Feature Image: Freepik
