সৃজনশীলতা বা ক্রিয়েটিভ বলতে আমরা আসলে কি বুঝি? এটি হল এমন একটি সক্ষমতা যা দিয়ে আমরা এক বা একাধিক ভাবনা একে অপরের সাথে যুক্ত করতে পারি এবং ওই ভাবনাগুলো নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করতে পারি। আর বর্তমানে আমাদের এই ক্রিয়েটিভিটির পথে বিজ্ঞানীরা কফিশপগুলোকে বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের মতে কফিশপগুলোর পরিবেশ আমাদের এই সক্ষমতাকে বাড়িয়ে তুলতে নানান ভাবে সাহায্য করছে।
ছোট বড় বেঞ্চিতে সাজানো, মাথার উপরে খোলা আকাশ, আবার কখনো সাজানো গোছানো ছিমছাম পরিবেশে মাঝবয়েসীদের ভিড়, হাতে হাতে রঙিন কাপে কফি বা চায়ের উষ্ণতা, কারো কারো উৎসুক চোখে প্রিয়জনের অপেক্ষা, আবার কখনো একাকী নিশ্চুপ সময়ের সঙ্গী হয়ে গরম কাপে ভাবনার ডুবে থাকা- চিরচেনা আমাদের এই কফিশপের চিত্র প্রথম এঁকেছিলো তুরষ্কের অটোমান সাম্রাজ্যের মানুষেরা। অটোমানদের হাত ধরেই প্রায় ১৮ শতকের দিকে তৈরি করা হয় প্রথম কফিহাউজটি।

তখনকার সময়ে কফিহাউজগুলো ছিলো নতুন নতুন চিন্তা ভাবনা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে। ভিন্ন মতের ভিন্ন ভিন্ন মানুষ কফিশপে জুড়ে দিতেন তাদের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা আর বিতর্ক। সেই থেকেই কিন্তু কফিহাউজগুলো মানুষের সৃজনশীলতার অন্যতম পরিচায়ক হয়ে উঠেছে। তবে কফিশপের ইতিহাস নিয়ে না হয় অন্যদিন ঘাটাঘাটি করা যাবে। আজ ফিরে আসি কিভাবে কফিশপগুলো আমাদের সৃজনশীলতার খোরাক জুগিয়ে যাচ্ছে।

কেন আমরা কফিশপে যাই?
অফিসের কাজের ফাঁকে, সারাদিনের ক্লান্তিকর ক্লাস শেষে বন্ধুবান্ধব বা একটু একাকী অবসর সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে আমরা কফিশপগুলোতে বিভিন্ন সময় ভিড় জমিয়ে থাকি। কফিশপগুলোর দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকেই চোখে পড়ে নানা বয়সের মানুষের আনাগোনা, গোছানো আরামদায়ক পরিবেশ, কিছু রঙ্গিন আলোর উষ্ণতা, কখনো ভেসে আসে মিউজিক প্লেয়ারে বাজানো শান্ত সুর আবার কখনো মানুষের মৃদু গুঞ্জনের শব্দ। সাইকোলজি বলে, আমরা যখনই আমাদের নির্দিষ্ট কাজের একঘেয়ে পরিবেশ হতে অবসর কাটানোর জন্য ভিন্ন কোন পরিবেশে প্রবেশ করি তখনই আমরা মানসিক ভাবে অনেকটা অবসাদমুক্ত হয়ে যাই। আর কফিশপের পরিবেশ ঠিক একই ভাবে আমাদের মানসিক ক্লান্তি থেকে আমাদের মুক্ত করে।
বিজ্ঞানীরা কফিশপের পরিবেশ আর সেখানে উৎপন্ন শব্দকে আলাদা ভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। সৃষ্ট শব্দকে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য করেছেন “ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ” হিসেবে। তাদের অনেকের মতে এই “ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজই” আমাদের সৃজনশীল চিন্তাকে বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে ।
২০১২ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় কফিশপগুলোর মৃদু সুর বা গুঞ্জনের শব্দ আমাদের চিন্তাশক্তির ক্ষমতাকে গভীর করতে সহায়তা করে। সেই পরীক্ষার মূল বক্তব্যই ছিলো “আপনি যখন কোন বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তা করতে থাকেন এবং সে সময় যদি আপনার আশেপাশে মৃদু শব্দ বাজানো হয়, যেটা আপাতদৃষ্টিতে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে বলে মনে হবে কিন্তু আসলে সেসব শব্দ আপনার চিন্তা করার ক্ষমতাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করে। কফিশপে উৎপন্ন এই নিম্নমধ্য পর্যায়ের শব্দগুলো শুনতে বেশ খানিকটা অগোছালো মনে হলেও এই শব্দ গুলো আমাদের চিন্তা করার শক্তিকে সক্রিয় করে তুলে। একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে বাইরের পরিবেশের সাথে, আপনি যে বিষয় নিয়ে ভাবতে চান সে বিষয় সম্পর্কিত নানা তথ্য অগোচরেই আপনার অবচেতন মন আপনাকে পাঠাতে শুরু করে।
আরও পড়ুনঃ পারফেকশনিজম: নিখুঁত ও নির্ভুলতা চর্চা যখন ক্ষতির কারণ
অফিসে প্রতিদিনের একই পরিবেশ, একই ডেস্ক, নিয়মে বাঁধা সময় – এসবই আমাদের সৃজনশীলতার পথে বাঁধা হয়ে দাড়ায়, আমাদের আউট অফ দ্যা বক্স ভাবতে দেয় না, একঘেয়েমিতা মগজ জাকড়ে ধরে।
২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষনায় “স্টকেস্টিক রেজোন্যান্স” নামে একটি নতুন ধারনার পরিচিতি তুলে ধরা হয়। স্টকেস্টিক রেজোন্যান্স বলতে বোঝায় এমন একটি ঘটনা যা পরিমিত মৃদু শব্দে আমাদের সম্ভাবনার প্রতি ইন্দ্রিয়গুলোকে সজাগ করে তোলে। মৃদুমন্দ আওয়াজ আমাদের মনে লুকায়িত অপক্ক, ক্ষীণ ভাবনাগুলোকে বের হওয়ার সুযোগ করে দেয়। যদিও এই শব্দের সীমা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। এই মৃদু শব্দ যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে তা আমাদেরকে অধিক ভালো সিদ্ধান্ত নিতে, চিন্তা করতে, মনোযোগী হতে সহায়তা করে। অনেক বিজ্ঞানীরা এই ধারনাটিকে “দ্যা কফিশপ ইফেক্ট” নামেও উল্লেখ করেছেন।

সময়ের বিবর্তনে জন্ম নেয়া বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই তাদের জীবনের সেরা কাজগুলো করেছেন খোদ এই কফিশপেই বসে। আমাদের আজকের শতকে হ্যারি পটারের নাম শুনেনি এমন খুব কম মানুষই খুজে পাওয়া যাবে। জে.কে রাওলিং হ্যারি পটারের পুরো সিরিজটাই কিন্তু লিখেছিলেন এডিনবার্গের একটা কফিশপে বসে। এছাড়া এই তালিকায় আরও আছেন, পাবলো পিকাসো, সিমোন ডে ভোওয়ার, জন-পল সার্ট্র, বব ডিলান সহ আরো অনেকে। এক কথায় বলা যায়, হোক চিত্রকার বা লেখক, গায়ক বা দার্শনিক সবাই তাদের অসাধারন ক্রিয়েটিভিটির প্রকাশ ঘটিয়েছেন কোন না কোন নির্জন কফিশপে বসেই।

সম্প্রতি নিউইয়র্কের বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর করিডন স্মিথও কফিশপে কাজ করার সুবিধার বিষয় নিয়ে একটি বিবৃতিতে বলেন- কোভিড -১৯ এর মহামারি আমাদের গতানুগতিক বহু ধারাকে পাল্টে দিয়েছে, পাল্টে দিয়েছে আমাদের নিত্যদিনের কর্মক্ষেত্রের সকল ব্যস্ততা। আর এই কারনে সবাই ঘরে বসে কাজ করাটাকেই অধিক প্রাধান্য দিচ্ছে। যদিও এই বদ্ধ ঘরের পরিবেশ আর ভাইরাসের ভয়াবহতার কারনে কমে যাচ্ছে আমাদের সৃজনশীলতা চর্চার সুযোগগুলো। তিনি আরো বলেন, কফিশপে বসে কাজ করার ফলে মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠে, যা তাদেরকে কাজের প্রতি অধিক মনোযোগী আর চনমনে রাখতে সহায্য করে। ভয়ানক এই ভাইরাস যুদ্ধে জয়ী হয়ে আবার প্রফুল্ল মনে কফিশপে বসে কাজ করার ইচ্ছেও প্রকাশ করেন তিনি।
সত্যিকার অর্থে, কফিশপে ভেসে আসা এলোমেলো শব্দের মিশ্রণ, সীমিত মানুষ এবং চারপাশের নানান চিত্র আমাদের ক্রিয়েটিভ সত্ত্বাকে করে তোলে আরও প্রখর। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে অনেকেই মনে করেন কফিশপের শব্দবহুল পরিবেশ আর লোক সমাগমই মানুষের কর্মস্পৃহার অন্তরায় হিসেবে কাজ করে – যা একেবারেই সঠিক নয়। যুগের সাথে তাল মিলাতে মিলাতে কফিহাউজগুলো এখন হয়ে উঠেছে মানুষের ক্রিয়েটিভিটির এক অনন্য পাওয়ারহাউজ। তাহলে ভবিষ্যতে আবার যখনই কফিশপে যাচ্ছেন তখনই কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক সৃজনশীল হয়ে উঠার আরেকটা সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। হয়ত এটিই হতে পারে আপনার শ্রেষ্ঠ কোন কাজের অনুপ্রেরণার কারণ!
References:
Feature Image: Unsplash
