একবার মনে করার চেষ্টা করে দেখুন তো আপনি শেষ কবে একা চুপচাপ কোন মিউজিক, বন্ধুবান্ধব, পরিবার, সোশ্যাল মিডিয়ার চিত্তবিনোদন এড়িয়ে শুধু নিজেকে নিয়ে ভেবেছেন? রাতের গভীরে অন্ধকার ঘরে কিংবা প্রকৃতির মাঝে একদম একা বসে ভাবার অনুভূতি কেমন জানেন? নাকি একাকী নিজের চিন্তাভাবনায় ডুবে থাকাকে ভয় পান আপনি?
সাধারন অর্থে বলা যায় মানুষভেদে অনেকেই একা থাকাটাকে পছন্দের থেকে অপছন্দই করে বেশি। আবার ভয়ও পায় কিছুক্ষেত্রে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে একা থাকার সুবিধাগুলোও নেহায়েৎ কম নয়। গবেষনায় আরও এসেছে একা থাকা আমাদের সৃজনশীলতাকে বাড়িয়ে দেয়, বাড়ায় নেতৃত্ব দেয়ার দক্ষতা, তাছাড়া মানসিক স্বাস্থ্যেও একা থাকার প্রভাব অনেক। ব্যক্তিগতভাবে একা থাকাটা পছন্দ করি আমি। কখনও কখনও দেখা যায় কথা বলতে পর্যন্ত অনীহা কাজ করছে। হয়ত ঠিক হয়েছে আত্মীয়স্বজনরা দল বেঁধে কোথাও যাবে, আমি তখন হাজারটা ছুতো খুঁজি তাতে অংশ না নেয়ার। কেউ বাসায় এলে কোনমতে এক আধটা কুশল বিনিময়। তারপর ছুটে নিজের ঘর। নিজের চিন্তাভাবনা।
এধরণের অসামাজিক প্রবণতাগুলো কিন্তু ঠিক আদর্শ নয়। এ ধরনের অসামাজিক প্রবনতাগুলোও মূলত আদর্শের মাপকাঠির বাইরে। সামাজিকতা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখা এক অর্থে ক্ষতিকর। বিশ্বের কিছু কিছু দেশে তো এটাকে সিরিয়াস সমস্যা ধরা হয়। বিশেষ করে বার্ধক্যগ্রস্থ জনসংখ্যার ক্ষেত্রে। যুক্তরাজ্যের দ্য রয়্যাল কলেজ অফ জেনারেল প্র্যাক্টিশনারসের মতে, একাকীত্বে মৃত্যুর ঝুঁকি আর ডায়াবেটিসে মৃত্যুর ঝুঁকির মাত্রা সমান। শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্ক মানসিক এবং শারিরীক দুটো স্বাস্থ্যের জন্যই প্রয়োজনীয়।
চূড়ান্ত সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বড় বড় সমস্যার জন্ম দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপঃ যেসব মানুষকে বন্দী করে রাখা হয়, যেসব বাচ্চারা নির্মম পরিবেশ বা অনাথ আশ্রমে নির্যাতিত হয়ে বড় হয়, এবং যে কয়েদীদের সম্পূর্ণ একা আলাদা সেলে বিচ্ছিন্ন রাখা হয় তারা সবাই-ই হ্যালুসিনেশনসহ বিভিন্ন প্রকার মানসিক অস্থায়িত্বে ভোগে।

এতক্ষণ যা বললাম সেগুলো অবশ্য একাকীত্বের চূড়ান্ত আর অনৈচ্ছিক ঘটনা। আমরা যারা স্বেচ্ছায় একা থাকাটা পছন্দ করি, একাকীত্ব তাদের জন্য বেশকিছু সুফলই বয়ে আনে।
প্রথমত সৃজনশীলতার উন্নতি ঘটে। ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান হোসে স্টেট ইউনিভার্সিটির গ্রেগরি ফেইস্ট সৃজনশীলতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন একটি চিন্তা অথবা কর্মকান্ড হিসেবে। যার মুখ্য উপাদান দুটোঃ মৌলিকত্ব ও কার্যকারিতা। তিনি গবেষণায় খুঁজে পেয়েছেন, ব্যক্তিত্বের যে অংশটুকু সাধারণত সৃজনশীলতার সাথে সম্পৃক্ত সেগুলো হচ্ছে- অকপটতা, আত্মবিশ্বাস এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা। আর এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে সমাজের প্রচলিত ব্যাপার নিয়ে মাথা না ঘামানো, একা থাকার প্রবণতা। বিজ্ঞানী ও শিল্পীদের নিয়ে করা ফেইস্টের গবেষণায় জানা গেছে, সৃজনশীলদের সবার মাঝে একটা লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য আছে। আর সেটা হচ্ছে সামাজিকতার প্রতি এদের অনাগ্রহ।

তারপর বলা যায় অভ্যন্তরীণ মনযোগের কথা। প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ জানে, বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক মনযোগের মাঝে সম্পর্ক আছে। ধার্মিক সাধুগণ যুগযুগ ধরে এজন্যই বোধহয় একাকীত্বের রীতি চালু রেখেছেন। ম্যাডিসনের ইউনিভার্সিটি অফ উইকন্সিন এর স্কুল অফ হিউম্যান ইকোলজির ক্লিনিক্যাল প্রফেসর ক্রিস্টিন হুইলান বলেছেন, ‘ইতিহাস জুড়ে মানুষের ব্যাক্তিগত বা ধর্মীয় কারণে একা থাকার নজির আছে অনেক।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা ছিলো নির্দিষ্ট একটা সময়ের জন্য জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার মাধ্যমে মানসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোন ঘটনার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। নিজের চিন্তায় ডুবে থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া কোনটার গুরুত্ব আছে আপনার কাছে। সাথে অগুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো বাদ দিয়ে দেয়া।’
আরও পড়ুনঃ আপনার পোষা বিড়াল কি সত্যিই আপনাকে অপছন্দ করে?
যখন আপনার আশেপাশে বা সামনে কেউ থাকবে, তখন না চাইলেও আপনার মস্তিষ্ক মনযোগ দেবে তাকে। এটা হতে পারে মনের জন্য একটা স্বস্তি বা কর্মবিরতি। কিন্তু আপনার চিন্তাভাবনা ঠিকই থেমে যাবে। আবার যখন সম্পূর্ণ একা থাকবেন আপনি, কতসব দিবাস্বপ্ন আর আকাশ-পাতাল চিন্তা ভর করবে মনে! এতে হবে কী, বাধাহীনভাবে আপনার মস্তিষ্ক ভাবার সুযোগ পাবে। ভাববে, স্মৃতি হাতড়াবে। গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করবে এটা-ওটা। অন্যের অনুভূতি ধরতে পারবেন। ফলাফলঃ মনযোগ বাড়বে, নিজেকে এবং অন্যকে বোঝা সহজ হবে। একটা সময় এই ব্যাপারগুলোই বরং আপনাকে আরও সামাজিক করে তুলবে।

একটা কথা, একাকীত্বের মানে বিচ্ছিন্নতা নয়। প্রয়োজনীয় একাকীত্ব আর ভয়ংকর বিচ্ছিন্নতার মাঝের সীমারেখা কখনো কখনো অস্পষ্ট হতে পারে৷ ফেইস্ট বলেন,
‘প্রায় সবকিছুই সঠিক ও ভুল উভয় ভাবেই গ্রহণ করা যায়। নির্ভর করে সেটা কতটা তীব্র হতে পারে তার উপর। ত্রুটিপূর্ণ ক্রিয়া থেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। যদি কেউ অন্যদের কথা ভাবাই বন্ধ করে দেয়, বিচ্ছিন্ন করে সবধরনের যোগাযোগ- সেটাকে সামাজিক সম্পর্কের প্রতি একধরণের অসুস্থতাই বলা যায়। কিন্তু সৃজনশীল অসামাজিকতা এর মাঝে পড়ে না।’
ফেইস্টের ভাষ্যমতে, ‘যে মানুষগুলো কখনও একা থাকেনি বরং তাদের মাঝেই থাকে সত্যিকার বিপদ।’
অন্তর্মুখী মানুষদের বন্ধু কম থাকে। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে সম্পর্কগুলো শক্তিশালী হয়। আর সুন্দর সম্পর্ক-ই সুখী করে মানুষকে, তাই নয় কি? কারণ পরিমাণের চাইতে গুণাগুণ গুরুত্বপূর্ণ কিনা। তাছাড়া নিজেকে সময় দেয়ার জন্য হলেও কিছুটা একা আর আলাদা সময় প্রয়োজন হয়। হয়ত ঐ সময়টাতে প্রিয় লেখকের বই পড়লেন আপনি। কিংবা নিজেই লিখে ফেললেন কিছু একটা। ভেবে ফেললেন কোন নকশা, নতুন কোন সৃষ্টি। প্রিয় গান গুনগুন করলেন। কেউ বাধা দেয়ার নেই, সমালোচনা করার নেই।

অতএব বলা যায়, যদি আপনি ‘সোশ্যাল বাটারফ্লাই’ নাও হয়ে থাকেন, চিন্তার কিছু নেই৷ নিজেকে বদলাতে হবে না আপনার। তবে হ্যাঁ, কিছু সতর্কীকরণ অবশ্যই রয়েছে। নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ থাকতে হবে আপনার, অনৈচ্ছিক একাকীত্ব বেছে নেয়া যাবে না, হাতে গোণা কয়েকজন হলেও ভালো বন্ধু থাকতে হবে, আর সৃজনশীল ও নিজের বা নিজের কাজের প্রতি মনযোগী হওয়া হতে হবে এই একাকীত্বের উদ্দেশ্য – এই সবগুলো যদি মানতে পারেন তাহলে থাকুন একা। কোন সমস্যা নেই। বরং আপনার এই একাকীত্বের পক্ষে আছে বিশেষজ্ঞদের যুক্তি!
This article is about the necessity of solitude in our daily life.
References :
Feature image: wallpapersden
