Punchforon

হুমায়ূন ফরীদি – খলনায়কের চরিত্রে নায়ক

হলে থাকা সব বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রের মতো হুমায়ূন ফরীদিও মাসকাবারি বাকী খেতেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে পড়াশোনা শেষ করে বেরুনো ফরীদির কাছে বাকী দিয়েছেন বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দোকানদাররা গল্প করেন, অভিযোগ করে নয়, গর্ব নিয়েই বলেন। বিখ্যাত অভিনেতা হয়ে যাবার পর ফের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন ফরীদি কোন এক অনুষ্ঠানের অতিথি হয়ে। সেখানেই সুমন নামের এক ছাত্র ঠাট্টা করে ফরীদিকে বলেছিলেন, “আলবেরুণী হলের ক্যান্টিনে আপনার নামে ৩১৯ টাকা বাকী আছে, টাকাটা দিয়ে যাবেন।” হুমায়ূন ফরীদি জবাবে বলেন, “আমি এইটা শোধ করব না।” সবাই কৌতূহলী হয়ে উঠল, “কেন কেন?” উনি তখন উত্তরে বলেন, “আমি এই ক্যান্টিন, হল, ক্যাম্পাস, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মানুষগুলোর কাছে আজীবন ঋণী থাকতে চাই।” ফেলে আসা বিশ্ববিদ্যালয়, হল, ক্যাম্পাসকে ভালবাসায়, মিস করায় কোন সাধারণ ছাত্র থেকে ফরীদির অনুভূতি কিছুমাত্র কম ছিল না। অসাধারণ মানুষ হয়েও এই ‘সাধারণত্ব’কে তিনি ছাপিয়ে যেতে চাননি। 

কথা রাখায় অদ্বিতীয়

হুমায়ূন ফরীদিকে নিয়েই ঠিক বিপরীত আরেকটা ঘটনা বলা যাক। শ্যুটিংয়ের জন্য বেশ কিছুদিন হোতাপাড়ায় থাকার কথা, হুট করে খবর যাওয়ায় পারিবারিক দরকারে ঢাকায় ফেরা জরুরী হয়ে পড়লো। দিনের শ্যুটিং শেষ করে বেরিয়ে পড়লেন একা, নিজেই ড্রাইভ করে ঢাকার পথে, এদিকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। বহুদূর চলে আসার পর মনে পড়লো প্রডাকশনে কাজ করে যে ছেলেটা, সেই ইউসুফকে কিছু টাকা বখশিশ দিতে চেয়েছিলেন, তাড়াহুড়ায় ভুলে গেছেন। গাড়ি ঘুরিয়ে এমন বৃষ্টির মাঝেই ফিরে গেলেন আবার, ইউসুফকে টাকা দিয়ে ফের ঢাকার পথে রওনা হলেন। 

শিল্পীর আঁকায় হুমায়ূন ফরীদি ; Source: Rokomari Blog

সেদিন ফিরতে বেশ রাত হয়েছিল বটে, তবে কথার বরখেলাপ তিনি করেননি। কথা দিয়ে কথা রাখতেন ফরীদি সবসময়ই, নামী অভিনেতা তিনি হয়েছিলেন, তবে নামীদামি অভিনেতার মতো শ্যুটিংয়ের শিডিউল দিয়ে শেষে পরিচালকদের ঝুলিয়ে দেয়ার বদঅভ্যেস তার কখনোই ছিল না। 

খ্যাতির বিড়ম্বনা

তবে হুমায়ূন ফরীদিকে নিয়ে সিনেমা করতে গিয়ে ঝক্কিঝামেলা পরিচালকদের ঠিকই পোহাতে হতো। একটা সময়ে খলনায়ক হয়েও জনপ্রিয়তায় নায়কদের পেরিয়ে গিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ হলে গিয়েছেন শুধু হুমায়ূন ফরীদি সিনেমায় আছেন বলে। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কোন খলনায়ক এতোখানি একক প্রভাব আর কেউই অর্জন করতে পারেননি। এমন জনপ্রিয় মানুষের শ্যুটিংয়ে জনগণের ভিড় সামলানোর হ্যাপা পরিচালককে সইতে তো হবেই। 

বদলে দেয়া হয়নি বাংলা সিনেমা

জনপ্রিয়তার সকল মাপকাঠি হুমায়ূন ফরীদি ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন ঠিকই, তবে যে লক্ষ্য নিয়ে সিনেমায় এসেছিলেন তা পূরণ হয়নি, বরং নিজেই এফডিসির বাঁধাধরা গল্পের সিনেমার চোরাবালিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। প্রতিভার গুণে দক্ষ অভিনয়শিল্পীর স্বকীয়তা তিনি সবকিছুতেই ধরে রেখেছেন, কিন্তু বদলে দেয়া হয়নি বাংলা সিনেমাকে। বদলে দেয়ার সামর্থ্য তার ছিল, এমন বিশ্বাস ছিল অনেকেরই। 

মঞ্চ থেকে টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রে

হুমায়ূন ফরীদির উপর এমন বিশ্বাস ছিল আরেক প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুরও। হুমায়ূন ফরীদি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি নিজেকে ফরীদির গুণমুগ্ধ ভক্ত যেমন দাবী করেন, একইভাবে সবচেয়ে বড় সমালোচক বলেও বিশেষায়িত করেন। এই মানুষটার হাত ধরেই একরকম অভিনয়ের ছোট পুকুর থেকে বড় নদীতে গিয়ে পড়েছিলেন ফরীদি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হুমায়ূন ফরীদি ; Source: Roar Media

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য সংগঠকদের মধ্যে হুমায়ূন ফরীদি তখন অন্যতম। তেমনই কোন এক নাট্য উৎসবের অতিথি হয়ে এসেছিলেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, হুমায়ূন ফরীদির একইসাথে নাট্য নির্দেশনা ও অভিনয় দেখে রীতিমতো মুগ্ধ হয়েছিলেন সে রাতে। তারপরই ফরীদিকে ঢাকা থিয়েটারে কাজ করার সুযোগ করে দেন ইউসুফ বাচ্চু। সেলিম আল দীনের মতো নাট্য বটবৃক্ষের ছায়ায় জাহাঙ্গীরনগরে নাটক শুরু করা হুমায়ূন ফরীদি এভাবেই ঢাকা থিয়েটারে যুক্ত হন, আমৃত্যু সম্পর্ক ছিল ফরীদির ঢাকা থিয়েটারের সাথে। সেলিম আল দীনও হুমায়ূন ফরীদির প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন সবসময় কিন্তু বানিজ্যিক চলচ্চিত্রের বেড়াজালে আটকে পড়া ফরীদিকে পছন্দ করেননি তিনিও। 

আরও পড়ুনঃ  কাজী নজরুল ইসলাম: একজন স্বভাব কবি 

মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন চারপাশে

অন্ধভক্তের সংখ্যাও কিন্তু কম ছিল না। সাধারণ মানুষ তো বটেই, বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরাও আকন্ঠ মুগ্ধতায় ডুবে ছিলেন ফরীদির অভিনয়ে। ওপার বাংলার বিখ্যাত চিত্র পরিচালক শিবপ্রসাদ ঘোষ ‘বেলাশেষে’ সিনেমার অভিনয় শিল্পীদের গ্রুমিং করতে গিয়ে টেনেছেন হুমায়ূন ফরীদির উদাহরণ, সে গ্রুমিং ক্লাসে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতাও ছিলেন। সবার প্রিয় অভিনেত্রী সুবর্ণা মোস্তফা যার সাথে হুমায়ূন ফরীদি বিচ্ছেদের পূর্বে বাইশ বছর সংসার করেছেন, তিনিও স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন,

“বন্ধু, প্রেমিক হিসেবে ফরীদিকে মিস করি না, তবে  গল্পের কিছু কঠিন চরিত্রে তাকে সবাই মিস করে, কঠিন সব চরিত্র তুড়ি মেরে করে ফেলতে পারতো, নেই বলে সেই গল্পে আর কাজ করা হচ্ছে না, আর কেউ নেই তার মতন।”  

কঠিন চরিত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী

সুবর্ণা মোস্তফা বন্ধু হিসেবে মিস না করলেও মিস কিন্তু অনেকেই করেন। কিংবদন্তি নাট্যকার শম্ভু মিত্র প্রিয় মানুষ হুমায়ূন ফরীদি সম্পর্কে বলেছেন,

“ওর সাথে কথা বলতে আরাম, মানুষ আমাকে হয় ঈশ্বর বানায় নয় গালি দেয়, বন্ধু কেউ হয় না যার সাথে অবসর কাটানো যায়।”

কঠিন চরিত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ফরীদি ; Source: প্রবাসীর দিগন্ত

 আড্ডাবাজ ফরীদি

আমাদের আরেক হুমায়ূন, লেখক হুমায়ূন আহমেদও তার আড্ডার প্রসঙ্গে বলেছেন। লেখক হুমায়ূন আহমেদ নিজেই তো আড্ডা জমানোর রাজা, সাহিত্য আর মিডিয়া জগতের অধিকাংশ মানুষ হুমায়ূন আহমেদের নুহাশ পল্লীর আড্ডায় গিয়ে বিভোর হয়ে বসে থাকতেন।

চিরতরুণ হুমায়ূন ফরীদি ; Source: Daily Ittefaq

সেই হুমায়ূন আহমেদও এক লেখায় ফরীদি সম্পর্কে লেখেন,

“বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বহু লোক একজনকে ঘিরে আছে, সবাই তার কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে, হাসছে, হাত তালি দিচ্ছে। দেখে মনে হলো যেন শব্দের জাদুকর! কাছে গিয়ে দেখি ঝাকড়া চুলের এক তাগড়া যুবক, কথা বলার মাঝেই একটা আর্ট ছিলো। অন্য যেকোনো দশটা মানুষ থেকে সহজেই তাকে আলাদা চেনা যেতো। মানুষটা হুমায়ুন ফরীদি!” 

কবি হুমায়ূন ফরীদি

কথার নেশায় মানুষকে বিভোর করে দেয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল হুমায়ূন ফরীদির। পর্দায় খলনায়কে অভিনয়ে বিখ্যাত হয়ে যাওয়া ফরীদি জাহাঙ্গীরনগরে সেলিম আল দীনের বাসার ছাদে ভুতের গল্প বলে সবাইকে ভয় পাইয়ে দিতে যেমন পারতেন, তেমনি কখনো কবিতার মতো মুগ্ধ করে রাখতেন আশেপাশের সবাইকে।

কবিতায় হুমায়ূন ফরীদি ; Source: YouTube

কবি অবশ্য তিনি ছিলেনই। একখানা কবিতা বরং এখানে তুলেই দেয়া যাক৷ ‘ছায়া’ শিরোনামে কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে, গণসাহিত্য নামের একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকার কার্তিক সংখ্যায়। 

“এই মাটি, মৃত্তিকার গান হঠাৎ হারিয়ে যায়

নিরাকার সন্ধ্যা বৃক্ষের ফোঁকরে বাঁধে বাসা

কুলবতী কালোবউ নদীজলে ধুয়ে ফেরে বাসন কোসন

হাওয়া কাঁপে হাওয়া, ঘাসের সান্নিধ্যে ঘুমোয়

বিন্দুজলে স্বচ্ছন্দ সংসার সুখ নীচে যত টুনীর পায়ের

একা একা কিশোরীর স্নেহ-ডোবা চোখে ভর করে

দুপুরের নির্জন ভীতি নিঃসহায় উনুনে পড়ে জল।

আমার ঘরের পাশে লম্বিত সুপুরীর গাছ

তবুও অপেক্ষা ক’রে মেঘে মেঘে ভিজে যায় বেলা

এই নদী ভেজে কাক ঘাটে বাঁধা নৌকোর

সুশীল পাটাতন, উচ্ছিষ্ট কচুরীর ফুল।” 

নিজেকে প্রমাণের আকাঙ্ক্ষা

আনু মোহাম্মদ খুব কাছে থেকে হুমায়ূন ফরীদিকে দেখে এসেছেন ছাত্রজীবনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোন আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল ফরীদির। নিজেকে প্রমাণ করার নেশা তার সবসময়ই ছিল। পরবর্তী জীবনে তাই বিচরণ করেছেন বহু ক্ষেত্রে, শুধু অভিনয় না, তিনি কবিতা লিখেছেন, গল্প লিখেছেন, বহু নাটক রচনা করে সেগুলোর মঞ্চায়ন করেছেন, নাট্য নির্দেশনা দিয়েছেন, পত্রিকায় কলাম লিখেছেন, সমালোচক হিসেবেও তিনি ছিলেন উচ্চদরের। 

মুক্তিযুদ্ধে হুমায়ূন ফরীদি

এতো সব কিছুর উপরে তার আরো একটি পরিচয় আছে, হুমায়ূন ফরিদী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসে প্রথম দিকে চাঁদপুর এবং পরবর্তীতে নিজ এলাকা কালীগঞ্জে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, আমাদের উপহার দিয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশ। মুক্তিযোদ্ধা নিশ্চয়ই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। ফরীদি নিজেও তাই মনে করতেন। বিটিভির এক সাক্ষাৎকারে এসে বলেছিলেন, “এই আমি একজন খারাপ মানুষের চরিত্রে অভিনয় করা খাঁটি সিনেমার মানুষ, কিন্তু আমি নায়কদের মত জনপ্রিয়, মঞ্চে এককালে যা অভিনয় করেছি মানুষ তা মনে রেখেছে, আর টেলিভিশনের যেখানেই যাই, সে যত বড় ডিরেক্টরই হোক এখনো আমাকে দেখে চেয়ার ছেড়ে দেয়। এই এত অর্জন দেশ স্বাধীন না হলে কোথ্বেকে হতো!” সত্যিই তাই, মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের চেয়ে বড় পরিচয় আর কী বা হতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, হুমায়ূন ফরীদির যুদ্ধের গল্প নিয়ে কেন যেন তেমন ইতিহাস চর্চা করা হয়নি। 

প্রস্থানের আখ্যান

ভাষা আন্দোলনের বছরে জন্ম নেয়া হুমায়ূন ফরীদির আজ উনসত্তরতম জন্মবার্ষিকী।

জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ফরীদি ;Source: Shadow News

আরো নয় বছর আগেই তিনি আমাদের ছেড়ে মহাকালের পথে যাত্রা করেছেন, বড্ড তাড়াতাড়িই চলে গেছেন। জীবনের শেষ ক’টা দিন ফরীদি কষ্ট আর একাকিত্বে কাটিয়েছেন, নিজেও চাইতেন নিরবে নিভৃতে হুট করে চলে যেতে, মনে জমেছিল হয়তো অজানা অভিমান। মেঘদল ব্যান্ডের সদস্য শিবু কুমার শীলের নেয়া এক সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন ফরীদি তখন অকপটে বলেছিলেন, “ভোরের শিশির আমি যার বেলা গড়িয়ে গেছে, টুপ করে হারিয়ে গেলে ক্ষতি নেই।”

সত্যিই ‘টুপ’ করে একদিন হারিয়ে গেলেন হুমায়ূন ফরীদি, ছেড়ে গেলেন আমাদের মতো অসংখ্য গুণমুগ্ধকে। আর ক্ষতি আছে কি নেই, তা তো দর্শক থেকে নির্মাতা সবাই টের পাচ্ছি হাড়ে হাড়ে।


Reference: 

  1. Humayun Faridi – A Man of Unmatched Impact 
  2. কিংবদন্তী হুমায়ূন ফরীদিঃ না থাকার ৯ বছর

Feature Image: Shadow News