Punchforon

চঞ্চল চৌধুরী – ধর্মের পরিচয়ে নয়, কর্ম দিয়েই যিনি আকাশ ছুঁয়েছেন

chanchal chowdhury with his mother

বাংলাদেশের সিনেমা এবং নাটকের সুদীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করে যদি সেরা অভিনেতাদের তালিকা করা হয় এবং যে নির্ণায়কেই তা পরিমাপ করা হোক না কেনো, চঞ্চল চৌধুরী নামটি সেখানে অবশ্যম্ভাবী। হলিউড অভিনেতাদের বয়সের সাথে তুলনা করলে তো বটেই, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও তিনি নিতান্তই একজন তরুণ অভিনয়শিল্পী। সেরা অভিনেতার তালিকায় অন্য কেউ তার চেয়ে কম বা সমসাময়িক বয়সে ঢোকার নজির এখন অবধি নেই। 

প্রতিভাবান তো বটেই, অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠা ও পরিশ্রম, চঞ্চল চৌধুরীকে তার তারুণ্যেই প্রতিষ্ঠিত করেছে অনন্য এক মাত্রায়। 

শিক্ষাজীবন থেকেই শুরু অভিনয়ের যাত্রা

সাতক্ষীরার মফস্বল শহরে জন্ম, বেড়ে উঠেছেন সংস্কৃতিমনা এক পরিবারে। অন্য ভাইবোনের সাথে পারিবারিক আবহে ছোটবেলায় শিখেছেন গান। খাতায় আঁকিবুঁকি করতেন, সে আগ্রহ থেকেই ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর ঢাকায় এসে চারুকলায় ভর্তি হওয়া। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে পড়াকালীন সময়েই ঢাকার থিয়েটারের সাথে পরিচয়, মঞ্চের প্রেমে পড়া তখন থেকেই। প্রখ্যাত অভিনেতা, নাট্য সংগঠক মামুনুর রশীদের নাট্যদল আরণ্যকে যোগ দেন, ইতিহাসের শুরুটা এভাবেই। 

আরণ্যকের সাথে মঞ্চে চঞ্চল চৌধুরী ; Image Source: Rising Bd

আসলেন, দেখলেন আর জয় করে ফেললেন – ইতিহাস তৈরীর গল্পটা এমন সহজ কিন্তু নয়। দীর্ঘদিন ব্যাকস্টেজে কাজ করেছেন স্রেফ সাহায্যকারী হিসেবে, মঞ্চ সাজিয়েছেন, পর্দা টেনেছেন, ওঠা নামা করিয়েছেন মঞ্চে আসবাবপত্রের। মাঝে কখনো কখনো মিলেছে খুচরো কোন চরিত্র, দুয়েকটা ডায়লগ বলার সুযোগ। নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ হয়নি তাতে। অপেক্ষা করতে হয়েছে বহুদিন। 

চঞ্চলের ভাগ্যে প্রথম শিকেটা ছেঁড়ে ‘কালো দৈত্য’ নাটকে। মিলেছিল বড় চরিত্র, অভিনয় দেখিয়ে বাজিমাত করেছেন নির্দেশক থেকে দর্শক সকলকে। এরপর একে একে শত্রুগণ, সংক্রান্তি, রাঢ়াঙের মতো নাটকে মঞ্চ মাতিয়েছেন, ছড়িয়েছেন মুগ্ধতা। 

টেলিভিশনে আগমনে ফের সংগ্রাম

নির্মাতা ফরিদুর রহমানের মাধ্যমে ‘গ্রাস’ নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশনে প্রথম পদচিহ্ন রাখেন চঞ্চল চৌধুরী। প্রতিভা তো তার ছিলই, চেষ্টার কমতি ছিল না কোথাও। নিজেকে উজার করে কাজ করতেন বলেই নির্মাতারাও তাকে নিয়ে কাজ করতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। ডাক পাচ্ছিলেন নিয়মিত, অভিনয় করে যাচ্ছিলেন একের পর এক নাটকে। কিন্তু লাইমলাইটে আসার মতো ব্রেক থ্রু কেন যেন ঘটছিল না দীর্ঘদিনেও। 

তরুন বয়সে চঞ্চল চৌধুরী ; Image Source: Dukhibd

অবশেষে সালাউদ্দিন লাভলু আর বৃন্দাবন দাসের সাথে জুটি করে প্রথম দর্শকদের নজর কাড়েন, মিডিয়াও নড়েচড়ে বসে ততদিনে। ভীষণ জনপ্রিয় হওয়া গ্রামীণ নাটকগুলোতে চঞ্চলকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করে সবাই। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি কখনো। গ্রাম-শহর ছাড়িয়ে চরিত্রের ভাঙাগড়ার খেলায় চঞ্চল চৌধুরী হয়ে উঠলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। 

রূপকথার গল্পে শুরু সিনেমার রূপকথা 

অভিনয় জীবনের প্রথম ধাপগুলোতে প্রচন্ড সংগ্রাম করে উঠে এসেছেন, পরিচয় দিয়েছেন ভীষণ ধৈর্য্য এবং নিষ্ঠার। সিনেমার গল্পটা কিন্তু একদমই উল্টো। 

প্রথম সিনেমা তৌকির আহমেদের ‘রূপকথার গল্প’, সেই থেকে আজ অবধি পুরো সিনেমা ক্যারিয়ারটাই যেন এক রূপকথা। চঞ্চল চৌধুরী যেন সেই রূপকথার সোনা রূপার জিয়ন কাঠি, ছুঁয়ে দিলেই সোনা ফলে। 

প্রথম সিনেমাতেই বাজিমাত করেছেন, বেকার যুবকের চরিত্রে যে মায়া ছড়িয়েছেন, মায়ায় আদ্র করেছেন প্রতিটা দর্শকের মন। প্রথমবারের মতো মিলেছে অভিনয়ের স্বীকৃতি সমালোচকদের কাছে থেকেও৷ প্রথম সিনেমাতেই মিলেছে মেরিল-প্রথম আলো  চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেতার পুরষ্কার। 

মনপুরা সিনেমায় চঞ্চল ও ফারহানা মিলি ; Image Source: Eproyojon

পেছনে তাকাতে হয়নি আর, গিয়াসউদ্দিন সেলিম পরিচালিত ‘মনপুরা’র সোনাই-পরীর প্রেম আর বিরহ এক যুগ পরে এসেও ছুঁয়ে দেয় আমাদের। আবার মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর ‘টেলিভিশন’ সিনেমায় দর্শকদের হাসাতে হাসাতে ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে মেসেজ দিয়ে গেছেন। গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষে’ কালুয়া হয়ে যেন অসাম্প্রদায়িকতার প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন অভিনয়ে। ‘দেবী’র মিসির আলী হওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন নির্ভীক চিত্তে, কতটুকু সফল কিংবা ব্যর্থতা বিচারের ভার দর্শক-সমালোচকের উপর ছেড়ে দিলেও অভিনয়ে কমতির অভিযোগ কিন্তু পরম শত্রুও করবে না। 

চরিত্রের ভাঙাগড়ায় অদ্বিতীয় চঞ্চল চৌধুরী ; Image Source: Punchforon

আর ‘আয়নাবাজি’ নিয়ে তো বলার প্রয়োজনই নেই, চঞ্চল এখানে নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন বারবার, অমিতাভ রেজা আর চঞ্চল চৌধুরী মিলে বাংলা সিনেমার ইতিহাস লিখেছেন নতুন করে। 

অর্জন, স্বীকৃতি, পুরষ্কার ও ভালোবাসায় চঞ্চল 

ক্যারিয়ারের শুরুতে মঞ্চ কিংবা মিডিয়ায় জায়গা করে নিতে যেমন সংগ্রাম করতে হয়েছে চঞ্চল চৌধুরীকে, ঝুলিতে স্বীকৃতি, সম্মান আর পুরষ্কারও কিন্তু এখন অবধি নেহায়েত কম নয়। 

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারে সেরা অভিনেতার খেতাব পেয়েছেন দুইবার। প্রথমবার ২০১০ সালে মনপুরা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ফেরদৌস আহমেদের সাথে যৌথভাবে এবং ২০১৬ সালে আয়নাবাজি সিনেমায় অভিনয়ের জন্য।  

মেরিল-প্রথম আলো পুরষ্কার নিচ্ছেন চঞ্চল চৌধুরী ; Source: Prothom Alo

মেরিল প্রথম আলো পুরষ্কারে সেরা চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন তিনবার এবং মনোনীত হিসেবেও ছিলেন তিনবার (দর্শক জরিপ এবং সমালোচক বিচারে)। নাটকে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতা পুরষ্কারের জন্য ছয়বার মনোনয়ন পেলেও চূড়ান্ত বিচারে বিজয়ী অবশ্য এখন অবধি হওয়া হয়নি চঞ্চল চৌধুরীর। 

আরটিভি স্টার এওয়ার্ডসে পাঁচবার মনোনীত হয়ে বিজয়ী হয়েছেন একবার। টিভি রিপোর্টার্স এওয়ার্ডে সেরা অভিনেতার পুরষ্কার জিতেছেন ২০১২ সালে। 

তাকদীর ওয়েব সিরিজে চঞ্চল চৌধুরী ; Source: News Bangla 24

সম্প্রতি আলোড়ন সৃষ্টি করা ‘তাকদীর’ ওয়েব সিরিজের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জিতেছেন চ্যানেল আই ডিজিটাল মিডিয়া  পুরষ্কার।  

পুরষ্কার, বিজয়ী, বিজেতা আর মনোনয়নের বেড়াজাল পেরিয়ে চঞ্চল চৌধুরী অভিনয় দিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে যে ভালোবাসার স্থান করে নিয়েছেন, তা মাপার অনুমাপক এখনো বিজ্ঞান আবিষ্কার করেনি। চঞ্চল চৌধুরী থাকলে আমরা অন্ধ বিশ্বাস নিয়েই সে নাটক সিনেমা দেখতে বসে যেতে পারি আজকাল এবং প্রতিবারই একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে শেষ করি। 

ধর্ম নয়, পরিচয় হোক কর্মে 

যে কথাটা লিখতে বসা, সে কথা লেখার আগেই এক লম্বা ফিরিস্তি দেয়া হয়ে গেল। কিন্তু কী বা করার, কাজ এবং অর্জনে চঞ্চল নিজেকে এমন অসীম এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যত লিখি তত যেন কম পড়ে যায়। অথচ এই মানুষটাকেই যখন কর্ম ছেড়ে ধর্ম দিয়ে বিচার করা হয়, সাম্প্রদায়িক নোংরামি ছড়িয়ে দিয়ে তার সকল কাজ এবং অর্জনকে পেছনে ফেলে দেয়ার পায়তারা চলে, তার চেয়ে দুঃখজনক আর কী ই বা হতে পারে? 

‘মা দিবস’ চলে গেল কিছুদিন আগেই, এখন যে কোন উদযাপনে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে গেছে। যে কোন অনুভূতিই আমরা শেয়ার করতে চাই সবার সাথে, আর মায়ের সাথে জড়িয়ে থাকা অনুভূতিগুলো তো আরো স্পেশাল। 

স্পেশাল চঞ্চলের জন্যও, সবার মতো তিনিও মায়ের সাথে চমৎকার একটি ছবি ফেসবুকে দিয়ে মা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। সেখানেই কিছু নেটিজেন সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে শুরু করে। 

ব্যাপারটা নতুন নয়, বছরের পর বছর ধরে সেলিব্রেটিদের পাবলিক প্রোফাইলে তাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো নিয়ে নোংরামো ছড়িয়ে আসছে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ। এদের বেশীরভাগই উদ্দেশহীন, স্রেফ ঠাট্টাচ্ছলেই শুরু হয়ে থাকে, তারপর তা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। সেলিব্রেটিরা ব্যস্ত থাকেন, তাদের চোখে পড়ে, হয়তো সময়ের অভাবেই এড়িয়ে যান বেশীরভাগ সময়। কিন্তু এমন নোংরা মন্তব্যগুলো যে তাদের মনে দিনের পর দিন ক্ষত তৈরী করে যাচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। 

যারা দিনরাত কষ্ট করে আমাদের আনন্দ বিনোদনের উপাদান তৈরী করে যাচ্ছে, বিনিময়ে এমন ক্ষত উপহার দেয়া ঠিক কতটা অমানবিক? 

হোক প্রতিবাদ 

এড়িয়ে যেতে যেতে সাইবার বুলি ভয়ংকরতার কতটা চরম পর্যায়ে পৌছে গেছে, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। সেলিব্রেটিদের বেশীরভাগ পোস্টের কমেন্ট সেকশনে গিয়ে সুস্থ মনে ফেরা কঠিন হয়ে যায়। এতো বেশী নোংরামির চিত্র দেখে আমরা হতাশ হয়ে পড়ি, সুস্থ মানুষই কি তবে আজ সংখ্যালঘুদের দলে?  

প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন মিডিয়ার তারকারা ; Image Source: Daily Ittefaq

আশার কথা, চঞ্চল চৌধুরীর মায়ের ছবিতে বাজে মন্তব্যের চেয়ে কয়েকশ গুণ বেশী মন্তব্য পড়েছে প্রতিবাদের। চঞ্চল চৌধুরী নিজে প্রতিবাদ করেছেন, অন্য অনেকের মতো এড়িয়ে যাননি, সাইবার ক্রাইম ব্রাঞ্চের সাহায্য নিয়েছেন। চঞ্চলের সমর্থনে পুরো সোশ্যাল মিডিয়ায় এক আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। চঞ্চল চৌধুরীর সহকর্মী অভিনয়শিল্পী থেকে শুরু করে মিডিয়া জগতের সবাই তো বটেই, অন্যান্য সেক্টরের সেলিব্রেটিরাও প্রতিবাদ করে গলা তুলেছেন, লিখেছেন, ‘চঞ্চল চৌধুরী আমার ভাই, চঞ্চল ভাইয়ের মা আমার মা’। এ প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল সাধারণ নেটিজেনদের মাঝে, ট্রেন্ডিং হয়েছিল প্রতিবাদের। 

শুধু চঞ্চল চৌধুরী নয়, ফেসবুক সহ অন্যান্য সকল সোশ্যাল মিডিয়ায় সাইবার বুলিংয়ের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকুক। আলোচনা সমালোচনা সীমাবদ্ধ থাকুক তাদের কাজের মধ্যেই। সেলিব্রেটি বলেই তাদের পারসোনাল লাইফ যে ‘পাবলিক প্রোপার্টি’ নয়, এ এথিকাল বোধের জন্ম হোক সকলের মাঝে। 

নিশ্চুপ থেকে এড়িয়ে যাওয়ার দিন পেরিয়ে সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে চলুক জোর প্রতিবাদ, হোক প্রতিবাদ।  

সোশ্যাল বুলিং এর বিরুদ্ধে চঞ্চল চৌধুরী রেসপন্স করেছেন খুব জোরালোভাবেই, যেনো সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসে, নিজের মত করে। 


References :

  1. Chanchal Chowdhury Filmography 
  2. Chanchal Chowdhury Movies, News, Interviews

Feature Image: Daily Star