‘ডিম আগে নাকি মুরগী?’ ছোটবেলায় অন্তত একবার হলেও নিশ্চয় এ প্রশ্নটি শুনেছেন। এখন হয়তো সবারই উত্তরটা মোটামুটি জানা। না জানলেও খুব একটা ক্ষতি নেই। কারন খাবার প্লেটে ডিম আগে আসুক কিংবা মুরগী,দুটোই বেশ আগ্রহ সহকারেই খাওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু খাবার প্লেটের বাইরেও আমাদের ইতিহাসে মুরগীর যে একটা বিরাট অবদান আছে,একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। আজকে ইতিহাসে মুরগীর এই অবদান নিয়েই থাকছে কিছু মজার আলোচনা।
আমরা বর্তমানে যে মুরগী দেখে অভ্যস্ত,এই মুরগী আসলে এসেছে লাল বোনমোরগ এবং এরকম আরও তিনটি প্রজাতি থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে। ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকেই এদের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এ অঞ্চলে প্রচুর বাঁশের বন ছিল। এই বাঁশ থেকে পাওয়া যেত ফল।যদিও এই ফল সবসময় হয় না। এক দশকে একবার পাওয়া যায়।তবে একবারে যতখানি ফল পাওয়া যেত,তা লাল বনমোরগের বংশবৃদ্ধি এবং খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট ছিলো।
মুরগীর উড়তে পারার ক্ষমতা একটু দুর্বল হওয়ায় এবং বসবাসের জন্য খুব কম পরিমাণ জায়গা লাগার সুবিধা নিয়েছিলো মানুষেরা।ফলে খুব সহজেই তারা মুরগী ধরে আটকে রাখতে পারতো এবং পোষ মানাতে পারতো। প্রায় ৭০০০ হাজার বছর আগে সর্বপ্রথম সিন্ধু সভ্যতায় গৃহপালিত মুরগীর সন্ধান পাওয়া যায়।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো,তারা খাওয়ার জন্য মুরগী পালতো না৷ তারা মুরগী পালতো মারামারির জন্য। বা আমরা যাকে বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘মোরগ লড়াই’ হিসেবে চিনি৷ ধীরে ধীরে এই মুরগী নামক বিশেষ পাখিটি সিন্ধু থেকে চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সর্বত্র মুরগীর চাহিদা বাড়তে থাকে,কেননা মুরগীর সবচেয়ে ইউনিক ব্যাপারটা হলো,সে প্রতিদিন ডিম দেয়। আবার এখানে একটা ঝামেলাও ছিলো।
মুরগী সাধারণত ৬-৭ টা ডিম দেয়ার পর,ডিম দেয়া থামিয়ে ২১ দিনের জন্য ডিমে তা দিতে বসে যেত। এই সমস্যা সমাধানের প্রথম উপায় বের করে মিশরীয়রা। ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের আশেপাশে কোনো একটা সময়ে তারা গরম ছাইয়ের ওপর ডিম রেখে এর একটা বিকল্প পদ্ধতি আবিষ্কার করে। ফলে মুরগীকে আর আলাদা করে ডিমে তা দেয়ার প্রয়োজন পড়তো না। মুরগী প্রতিদিনই ডিম দিতে শুরু করে। এবং ডিম অন্তর্ভুক্ত হ য়ে যায় মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভাসে। ঠিক একই সময়ে ফিনিশিয়ান ব্যাবসায়ীরা সর্বপ্রথম ইউরোপের সাথে মুরগীর পরিচয় ঘটায়। খুব দ্রুতই মুরগী ইউরোপের গৃহপালিত পশুপাখিদের দলে নিজেকে মানিয়ে নেয়।
এসকল গুরুগম্ভীর ইতিহাসের বাইরেও মুরগীর আরও কিছু মজাদার ইতিহাস আছে। গ্রীসে ‘মোরগ লড়াই’ করা হতো তরুণ যোদ্ধাদেরকে অনুপ্রেরণা যোগানোর জন্য। রোমানরা তাদের যুদ্ধের ভবিষ্যৎ পরিণাম জানার জন্য যুদ্ধের সময় মুরগী সাথে করে নিয়ে যেত।
আফিম যুদ্ধের পরে চীন থেকে ইংল্যান্ডে মুরগী নিয়ে যাওয়া হয় এবং ক্রসব্রিডের মাধ্যমে নতুন প্রজাতির প্রচুর মুরগী তৈরি করা হয়।এর ফলে ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী এবং আরো বেশি ডিম দেওয়া মুরগীর উৎপত্তি হয়। এবং সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই পদ্ধতিকে বিশেষভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই চার্লস ডারউইন তার বিখ্যাত ‘থিওরি অফ ইভোলিউশন’-এর কাজ শেষ করে।
তো মোরগ লড়াই থেকে শুরু করে ডিম দেওয়া, ভবিষ্যৎবাণী করা থেকে শুরু করে রিসার্চ সাব্জেক্ট, সবকিছুতেই মুরগীর আবির্ভাব ঘটেছে নানান ভূমিকায়। সুতরাং আগে আসার ক্ষেত্রে ডিম-মুরগীর বিবাদকে পাশে সরিয়ে রাখলেও, ইতিহাসে মুরগীর অবদান কিন্তু একেবারেই উপেক্ষা করার মতো না।
This Bangla Article is about the history and evolution of chicken from the jungle to our daily foods.
References:
- The Domestication History of Chickens
- History of the Chicken
- How the Chicken Conquered the World
- History through the eyes of a chicken
Feature Image: Freepik
